রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক বাজেট প্রস্তাবে সুন্দরবনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (PPP মডেলে) ইকো ট্যুরিজম গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘোষণাকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত অনুন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সংকট, জলবায়ু বিপর্যয় এবং জীবিকার অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করা সুন্দরবনের মানুষের কাছে উন্নয়নের যে কোনো সম্ভাবনাই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই উন্নয়ন কার জন্য? সুন্দরবনের মানুষ কি সত্যিই এর সুফল পাবেন, নাকি “ইকো ট্যুরিজম” নামের আড়ালে আবারও বড় পুঁজি ও কর্পোরেট স্বার্থই প্রধান হয়ে উঠবে?
“ইকো ট্যুরিজম” শব্দটি শুনতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর মধ্যে যেমন রয়েছে পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি, তেমনই রয়েছে স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার সম্ভাবনা। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের প্রকল্প পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়ে দাঁড়ায় বাণিজ্যিক পর্যটনের আরেকটি রূপ। পাহাড়, সমুদ্র কিংবা বনাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে—স্থানীয় মানুষদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে বড় বড় রিসোর্ট, বিলাসবহুল পর্যটন কেন্দ্র, ব্যক্তিমালিকানাধীন জেটি বা বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। ফলে প্রকৃতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনই স্থানীয় মানুষ নিজের জমি, জীবিকা ও অধিকার থেকেও ক্রমশ দূরে সরে গেছেন।
সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ সুন্দরবন কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি একটি জীবন্ত ভূখণ্ড। নদী, ম্যানগ্রোভ বন, মাছধরা, মধু সংগ্রহ, কৃষিকাজ, লোকসংস্কৃতি—সব মিলিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে এক স্বতন্ত্র জীবনব্যবস্থা। এই ভূখণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লক্ষ মানুষের অস্তিত্ব। তাই সুন্দরবনের উন্নয়ন নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত এখানকার মানুষের মতামত ও অধিকার।
আজ যদি ইকো ট্যুরিজমের নামে বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলি সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে আধিপত্য বিস্তার করে, তাহলে স্থানীয় মানুষ কোথায় দাঁড়াবেন? গ্রামের যুবকদের কি স্থায়ী কর্মসংস্থান হবে, নাকি তারা শুধুই অস্থায়ী শ্রমিক হয়ে থাকবেন? পর্যটনের আয় কি স্থানীয় অর্থনীতিতে ফিরবে, নাকি অধিকাংশ মুনাফাই বাইরে চলে যাবে?
আরও বড় প্রশ্ন হলো পরিবেশগত ভারসাম্য। সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল পরিবেশ অঞ্চল। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততার বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বিপদের মুখে এই অঞ্চল প্রতিনিয়ত লড়াই করছে। এমন পরিস্থিতিতে অপরিকল্পিত পর্যটন প্রকল্প, অতিরিক্ত নির্মাণ, নদীপথে বাণিজ্যিক যাতায়াত বৃদ্ধি কিংবা প্লাস্টিক ও বর্জ্যের চাপ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
প্রকৃত অর্থে ইকো ট্যুরিজম মানে শুধু পর্যটক আনা নয়। এর অর্থ হলো—প্রকৃতিকে রক্ষা করে স্থানীয় মানুষকে কেন্দ্র করে টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা। সুন্দরবনের মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী, স্থানীয় মৎস্যজীবী, নৌকাচালক, হস্তশিল্পী, লোকশিল্পী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অংশীদার না করে কোনো প্রকল্পই “ইকো” হতে পারে না। সমবায়ভিত্তিক হোম-স্টে, স্থানীয় গাইড প্রশিক্ষণ, পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা—এসবই হওয়া উচিত উন্নয়নের মূল ভিত্তি।
সরকার যদি সত্যিই সুন্দরবনের উন্নয়ন চায়, তাহলে প্রথম শর্ত হওয়া উচিত স্বচ্ছতা। কোন সংস্থা প্রকল্প পাবে, কীভাবে জমি ব্যবহার হবে, পরিবেশগত প্রভাব কী হতে পারে, স্থানীয় মানুষের অংশীদারিত্ব কতটা থাকবে—এসব বিষয়ে জনসমক্ষে পরিষ্কার তথ্য তুলে ধরা প্রয়োজন। উন্নয়ন কখনোই মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না; উন্নয়ন তখনই সফল হয়, যখন মানুষ নিজেই তার অংশীদার হন।
সুন্দরবনকে শুধুমাত্র বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। এটি এমন এক ভূখণ্ড, যা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা বিশ্বের পরিবেশগত নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। এখানকার বন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এবং লক্ষ মানুষের জীবনধারণের ভিত্তি তৈরি করে।
তাই সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রকৃতি ও মানুষকে আলাদা করে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুন্দরবন বাঁচলে তবেই সুন্দরবনের মানুষ বাঁচবেন; আর সুন্দরবনের মানুষ বাঁচলে তবেই সত্যিকারের অর্থে সুন্দরবন রক্ষা পাবে।