গোপন ঘরে ত্রাণের পাহাড়! কুলপির তৃণমূল অফিসে হানা, উদ্ধার গাড়ি গাড়ি সামগ্রী
- ফ্যাক্ট ফাইল | Jun 12, 2026
নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক- - দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলপি বিধানসভা এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের একটি পার্টি অফিস থেকে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ ত্রাণসামগ্রী দীর্ঘদিন ধরে পার্টি অফিসে গোপনে মজুত করে রাখা হয়েছিল। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে কুলপি থানার পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং বিজেপি কর্মীরা স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে ওই পার্টি অফিসে অভিযান চালায়। অভিযানের পর একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কুলপি বিধানসভার অন্তর্গত ওই পার্টি অফিসের দোতলায় দীর্ঘদিন ধরে বস্তাবন্দি বিপুল পরিমাণ মালপত্র রাখা ছিল। খবর পেয়ে কুলপি থানার পুলিশ কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। অভিযানের সময় বিজেপি কর্মী ও বহু স্থানীয় বাসিন্দাও উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি। পুরো ঘটনাটির ভিডিওগ্রাফিও করা হয় বলে সূত্রের খবর।
.jpeg)
নিজস্ব চিত্র
অভিযানকারী দল দোতলায় উঠে একটি ঘরের দরজা খুলতেই চোখ কপালে ওঠে উপস্থিত সকলের। অভিযোগ, ঘরের ভিতরে সারি সারি বস্তায় ভরা ছিল ত্রাণ সামগ্রী। কয়েকটি বস্তা খুলে দেখা যায় সেখানে রয়েছে কম্বল, শাড়ি, শিশুদের পোশাক, লুঙ্গি, বেড কভার-সহ বিভিন্ন সামগ্রী। এছাড়াও বিপুল পরিমাণ ত্রিপল মজুত থাকার অভিযোগ ওঠে।

নিজস্ব চিত্র
অভিযোগকারীদের দাবি, এই সমস্ত সামগ্রী মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ঈদের সময় বিতরণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় পরিবারগুলির সাহায্যের জন্য আনা হয়েছিল। কিন্তু সেই ত্রাণসামগ্রী প্রকৃত উপভোক্তাদের হাতে পৌঁছয়নি। বরং দীর্ঘদিন ধরে পার্টি অফিসেই লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, পরবর্তীতে এই সামগ্রী বিক্রি করার পরিকল্পনাও ছিল।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বহু স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানান, প্রয়োজনে বারবার তৃণমূল নেতৃত্বের দ্বারস্থ হলেও কোনও সাহায্য পাননি তাঁরা। অথচ সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ ত্রাণসামগ্রী বছরের পর বছর ধরে পার্টি অফিসে পড়ে ছিল বলে অভিযোগ।
উদ্ধার হওয়া সামগ্রী পরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় গাড়িতে করে কুলপি বিডিও অফিসে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামগ্রীর তালিকা তৈরি এবং তদন্তের কাজ শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর। যদিও এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এই ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিজেপি। বিজেপি নেতা পীযূষ বিক্রম অভিযোগ করে বলেন, “সাধারণ মানুষের জন্য আসা ত্রাণসামগ্রী সাধারণ মানুষকে না দিয়ে নিজেদের দখলে রেখে দিয়েছিল তৃণমূলের নেতারা। যেটা অসহায় মানুষের পাওয়ার কথা ছিল, সেটা তাদের দেওয়া হয়নি। সরকারি ত্রাণ মানুষের হাতে না পৌঁছে পার্টি অফিসে পড়ে নষ্ট হচ্ছিল। এটা চরম দুর্নীতির উদাহরণ।
তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাঁর অভিযোগ, “ত্রাণ নিয়ে রাজনীতি এবং আত্মসাৎ—দুটোই হয়েছে এখানে।
অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগেও উঠে এসেছে বঞ্চনার ছবি। এলাকার বাসিন্দা লক্ষ্মী ঘোষ বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমার বাড়ির ছাদ ভেঙে গিয়েছিল। আমি বারবার তৃণমূল নেতাদের কাছে ত্রিপলের জন্য গিয়েছি। কিন্তু আমাকে বলা হয়েছে কোনও ত্রিপল নেই। এখন দেখছি হাজার হাজার ত্রিপল মজুত রয়েছে। সাধারণ মানুষের জিনিস এভাবে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে এখনও পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতৃত্বের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, অভিযোগগুলি সত্য প্রমাণিত হলে তা বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ ত্রাণসামগ্রী কীভাবে একটি রাজনৈতিক দলের পার্টি অফিসে এতদিন ধরে মজুত ছিল? কার নির্দেশে সেই সামগ্রী সেখানে রাখা হয়েছিল? কেন প্রকৃত উপভোক্তাদের হাতে তা পৌঁছয়নি? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্তে নেমেছে প্রশাসন। কুলপির এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই এলাকাজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে।
