নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: সুন্দরবন-সহ জেলার উপকূলবর্তী এলাকায় বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার দাপট। উত্তাল নদী ও সমুদ্রের কারণে গঙ্গাসাগর, বকখালি ও মৌসুনিতে সমুদ্রস্নানে নিষেধাজ্ঞা। একটানা বৃষ্টিতে আমন ধান ও শীতকালীন সবজি চাষে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে প্রশাসন।দক্ষিণ ২৪ পরগনা: ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে সৃষ্ট নিম্নচাপের জেরে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মুখে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা। রাতভর দফায় দফায় ভারী বৃষ্টিতে ভিজেছে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। বিশেষ করে সুন্দরবন-সহ উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলিতে বৃষ্টির দাপট তুলনামূলক বেশি বলে জানা গিয়েছে। বৃষ্টির পাশাপাশি বইছে দমকা হাওয়া। কালো মেঘে ঢেকেছে আকাশ। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উদ্বেগ বেড়েছে কৃষকদের মধ্যেও।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিনভর বৃষ্টি চলতে পারে। ফলে দুর্যোগের পরিস্থিতি কতক্ষণ স্থায়ী হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একদিকে নদী ও সমুদ্র উত্তাল থাকায় উপকূলবর্তী পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে, অন্যদিকে টানা বৃষ্টিতে মাঠের ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চাষিরা। বিশেষ করে আমন ধান প্রায় পাকার মুখে থাকায় এই সময়ে অতিবৃষ্টি হলে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
রাত থেকেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বৃষ্টি শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ায় আবহাওয়ার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সুন্দরবন এবং জেলার উপকূলবর্তী এলাকায় বৃষ্টির প্রভাব বেশি অনুভূত হচ্ছে। আকাশে ঘন কালো মেঘের উপস্থিতি এবং দমকা হাওয়ার কারণে স্বাভাবিক জনজীবনেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে তার প্রভাব শুধু বসতবাড়ি বা রাস্তাঘাটেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নদী ও সমুদ্রের জলস্তর, ফেরি চলাচল, মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলির উপরও প্রভাব পড়তে পারে। সেই কারণে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় প্রশাসনিক সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে জেলার কোথায় কতটা বৃষ্টি হয়েছে, কোনও এলাকায় জল জমেছে কি না কিংবা ঝড়ে গাছ বা বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ার মতো ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির ছবি স্পষ্ট নয়।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা জারি রয়েছে জেলার উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে। নদী ও সমুদ্র উত্তাল থাকায় গঙ্গাসাগর, বকখালি ও মৌসুনিতে সমুদ্রস্নানে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সমুদ্রের ঢেউ ও স্রোতের পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠলে পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে এই ধরনের পদক্ষেপ জরুরি।
গঙ্গাসাগর, বকখালি ও মৌসুনি পর্যটকদের কাছে পরিচিত গন্তব্য। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে বহু মানুষ সেখানে বেড়াতে যান। কিন্তু দুর্যোগের সময় সমুদ্রের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। বাইরে থেকে সমুদ্র শান্ত মনে হলেও শক্তিশালী স্রোত বা বড় ঢেউয়ের কারণে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে সমুদ্রে নামা বিপজ্জনক হতে পারে।
পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সমুদ্রসৈকতে সতর্কতামূলক নির্দেশিকা থাকলে তা অনুসরণ করা এবং নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ না করাই নিরাপদ। পাশাপাশি নদী পারাপার বা নৌকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ অংশ নদী, খাঁড়ি ও সমুদ্রঘেঁষা হওয়ায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। ভারী বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া বইলে নিচু এলাকা, দুর্বল বাড়িঘর এবং নদীর তীরবর্তী বসতিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি জল জমে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই পরিস্থিতিতে উপকূলবর্তী এলাকায় সতর্কতা বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়ার পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ অনুসরণ করা এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাতায়াত এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে নদী বা সমুদ্রের কাছে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। ঝড়ো হাওয়ার সময় দুর্বল গাছ, বিদ্যুতের তার এবং অস্থায়ী কাঠামোর কাছাকাছি থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ভারী বৃষ্টির মধ্যে জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি দিক হল কৃষিক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বহু কৃষক এখন আমন ধান চাষের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। জমির ধান প্রায় পাকার মুখে। এই সময়ে একটানা ভারী বৃষ্টি হলে ধানগাছের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
ধান পাকার সময় জমিতে অতিরিক্ত জল জমে থাকলে গাছের গোড়া ও মাটির অবস্থার উপর প্রভাব পড়তে পারে। ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হলে পাকা ধানগাছ মাটিতে হেলে পড়ার আশঙ্কাও থাকে। ধানগাছ মাটিতে শুয়ে পড়লে ফসল কাটা কঠিন হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে শস্যের গুণমানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কৃষকদের উদ্বেগের কারণ এখানেই। দীর্ঘদিন ধরে পরিচর্যা, সার, বীজ, শ্রম এবং অন্যান্য খরচের পর ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা। ঠিক এই সময়ে দুর্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রত্যাশিত উৎপাদন না পাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। ফলে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখছেন জেলার চাষিরা।
শুধু আমন ধান নয়, একটানা বৃষ্টিতে শীতকালীন সবজি চাষ নিয়েও চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে জমিতে জল জমে গেলে সবজির গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘ সময় মাটি ভিজে থাকলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কিছু রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সবজি চাষে জমির জলনিকাশি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টির জল দ্রুত বেরিয়ে যেতে না পারলে চারাগাছ ও সদ্য বেড়ে ওঠা গাছের ক্ষতি হতে পারে। আর্থিকভাবে অনেক কৃষক সীমিত পুঁজিতে চাষ করেন। তাই ফসলের ক্ষতি হলে তাঁদের পরবর্তী চাষের খরচ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে বাস্তবে কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা জানতে বৃষ্টির পর জমির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বৃষ্টির পর জল কতক্ষণ জমে থাকছে, গাছের কতটা ক্ষতি হয়েছে এবং ফসলের বর্তমান অবস্থা কেমন—এসবের উপর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কৃষকদের জমির পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। জমিতে জল জমে থাকলে নিরাপদ ও সম্ভবপর উপায়ে জলনিকাশির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে জল সরানোর জন্য কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার আগে জমির প্রকৃতি এবং স্থানীয় কৃষি দপ্তরের পরামর্শ বিবেচনা করা উচিত।
ধান বা সবজির ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে স্থানীয় কৃষি আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে মাঠে কাজ করা বা জলমগ্ন জমিতে নামার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। দুর্যোগের সময় আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কৃষিকাজ এড়িয়ে চলা উচিত।
কোনও জমিতে ফসলের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হলে তার ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করলে পরবর্তী সময়ে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে সুবিধা হতে পারে। তবে ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণের জন্য মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় একদিকে ভারী বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার প্রভাব, অন্যদিকে উত্তাল নদী-সমুদ্রের কারণে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন জেলাবাসী। উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই কৃষিক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশেষ করে আমন ধান পাকার মুখে থাকায় কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। দুর্যোগ দ্রুত কেটে গেলে ফসলের ক্ষতি সীমিত থাকতে পারে, কিন্তু বৃষ্টি দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শীতকালীন সবজি চাষের ক্ষেত্রেও একই উদ্বেগ রয়েছে।
দুর্যোগের এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক নির্দেশ মেনে চলা, সমুদ্রস্নান থেকে বিরত থাকা এবং কৃষিজমির পরিস্থিতির উপর নজর রাখাই আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।