নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: শরীরের পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে ম্যাগনেসিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ। এর ঘাটতি হলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, পেশিতে টান, অসাড়তা কিংবা ঝিনঝিন করার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে চোখের নিচে কালো দাগ বা ত্বকের সমস্যা মানেই ম্যাগনেসিয়ামের অভাব নয়। লক্ষণগুলি বুঝে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।শরীর সুস্থ রাখতে প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজের প্রয়োজন হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানগুলির মধ্যে অন্যতম হল ম্যাগনেসিয়াম। শরীরের শক্তি উৎপাদন, পেশির সংকোচন ও প্রসারণ, স্নায়ুর কার্যকলাপ এবং হাড়ের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই খনিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু খাদ্যাভ্যাসে ঘাটতি, কিছু দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধের প্রভাবে শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা কমে যেতে পারে।
অনেক সময় শরীরের ছোটখাটো পরিবর্তনকে আমরা গুরুত্ব দিই না। চোখের পাতা কাঁপা, পেশিতে টান ধরা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি কিংবা হাত-পায়ে ঝিনঝিন করার মতো লক্ষণ দেখা দিলেও অনেকে সেগুলিকে সাময়িক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। যদিও এসব উপসর্গের পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে, কিছু ক্ষেত্রে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতিও তার মধ্যে একটি। তাই লক্ষণগুলি দীর্ঘস্থায়ী হলে বা একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ম্যাগনেসিয়াম শরীরের বহু জৈবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। খাবার থেকে শক্তি তৈরি করা, পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজ বজায় রাখা এবং হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয়। শরীরে ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো অন্যান্য খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতেও ম্যাগনেসিয়ামের ভূমিকা রয়েছে।
শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। ঘাটতি গুরুতর হলে পেশিতে খিঁচুনি, অসাড়তা, ঝিনঝিন ভাব, হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা এবং কিছু ক্ষেত্রে খিঁচুনির মতো জটিল সমস্যাও হতে পারে।
তবে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে শুধু খাবারে ম্যাগনেসিয়াম সামান্য কম থাকলেই সাধারণত গুরুতর ঘাটতি তৈরি হয় না। কিডনি অতিরিক্ত ম্যাগনেসিয়াম বের করে দেওয়ার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে শরীরে এর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই কোনও উপসর্গ দেখা দিলেই ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
চোখের পাতা অনিচ্ছাকৃতভাবে কেঁপে ওঠাকে অনেকেই ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত করেন। কিন্তু চোখের পাতা কাঁপার সাধারণ কারণের মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ এবং চোখের ক্লান্তি। দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে পেশি ও স্নায়ুর অস্বাভাবিক কার্যকলাপের সঙ্গে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতির সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র চোখের পাতা কাঁপার ভিত্তিতে শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা কমেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
চোখের পাতা বারবার কাঁপলে প্রথমে পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম এবং ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে, চোখ বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা তৈরি হলে কিংবা মুখের অন্য অংশেও অনিয়ন্ত্রিত পেশির নড়াচড়া দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতির অন্যতম পরিচিত উপসর্গ হল পেশিতে খিঁচুনি বা টান ধরা। এর ফলে পায়ের পেশি, হাত কিংবা শরীরের অন্য অংশে অস্বস্তি হতে পারে। হাত-পায়ে অসাড়তা বা ঝিনঝিন ভাবও দেখা দিতে পারে। গুরুতর ঘাটতি হলে স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যকলাপ ব্যাহত হতে পারে।
তবে পেশিতে টান ধরার পিছনে শুধু ম্যাগনেসিয়ামের অভাব দায়ী নয়। অতিরিক্ত ব্যায়াম, পানিশূন্যতা, পটাশিয়াম বা ক্যালসিয়ামের ভারসাম্যহীনতা এবং স্নায়ুর সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। চোয়ালে টান লাগার ক্ষেত্রেও দাঁত চেপে রাখা, ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষা, চোয়ালের সন্ধির সমস্যা বা পেশির অতিরিক্ত চাপের মতো কারণ থাকতে পারে।
চোয়ালের টানের সঙ্গে বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঘাম বা বমি বমি ভাব দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিকে শুধু খনিজের ঘাটতি বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
চোখের নিচে কালো দাগ, ত্বকের শুষ্কতা কিংবা ত্বকের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়াকে অনেক সময় শরীরে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু এই লক্ষণগুলি ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতির নির্দিষ্ট বা নির্ভরযোগ্য চিহ্ন নয়।
চোখের নিচে কালো দাগের কারণ হতে পারে বংশগত বৈশিষ্ট্য, ঘুমের অভাব, অ্যালার্জি, বয়সজনিত পরিবর্তন কিংবা চোখের চারপাশের ত্বকে রঞ্জকের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। একইভাবে ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে আবহাওয়া, ত্বকের যত্নের অভাব, একজিমা বা অন্য কোনও চর্মরোগের কারণে।
তাই চোখের নিচে কালো দাগ বা ত্বকের পরিবর্তন দেখা দিলে নিজের সিদ্ধান্তে ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসক বা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা ভালো।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি। যেমন—
যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খেতে পারছেন না।
যাঁদের দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া বা অন্ত্রের পুষ্টি শোষণে সমস্যা রয়েছে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কিছু ব্যক্তি, বিশেষ করে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ ঠিক না থাকলে।
যাঁরা দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মদ্যপান করেন।
বয়স্ক ব্যক্তি, যাঁদের খাদ্যগ্রহণ কমে যেতে পারে বা অন্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে।
যাঁরা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ, যেমন কিছু মূত্রবর্ধক ও দীর্ঘদিন অ্যাসিড কমানোর ওষুধ গ্রহণ করেন।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে রক্তে ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা পরীক্ষা করতে পারেন।
প্রতিদিনের সুষম খাদ্য থেকেই ম্যাগনেসিয়ামের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব। তাই খাবারের তালিকায় বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর উপাদান রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ কয়েকটি খাবার হল—
বাদাম ও বীজ: কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, কুমড়োর বীজ ও অন্যান্য বীজ।
ডাল ও শিমজাতীয় খাবার: মসুর ডাল, ছোলা, রাজমা এবং বিভিন্ন ধরনের বিনস।
সম্পূর্ণ শস্য: ওটস, লাল চাল ও অন্যান্য গোটা শস্যজাতীয় খাবার।
সবুজ শাকসবজি: পালং শাকের মতো সবুজ পাতাযুক্ত শাক।
অন্যান্য খাবার: কিছু মাছ, সয়া-জাতীয় খাবার এবং ডার্ক চকোলেটেও ম্যাগনেসিয়াম পাওয়া যায়।
প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ডাল, বাদাম, বীজ ও সম্পূর্ণ শস্যের বৈচিত্র্য রাখলে ম্যাগনেসিয়ামসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পাওয়া সহজ হয়। <Cite refs={["turn593951search3","turn593951search5"]}/>
প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ম্যাগনেসিয়ামের চাহিদা বয়স ও লিঙ্গের উপর নির্ভর করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে দৈনিক চাহিদা সাধারণত ৪০০–৪২০ মিলিগ্রাম এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে ৩১০–৩২০ মিলিগ্রাম। গর্ভাবস্থায় চাহিদা আরও কিছুটা বাড়তে পারে। এই পরিমাণগুলি সাধারণ নির্দেশক; ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও স্থানীয় পুষ্টি নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।
তবে বেশি ম্যাগনেসিয়াম খেলেই যে শরীর বেশি সুস্থ থাকবে, এমন নয়। খাবার থেকে অতিরিক্ত ম্যাগনেসিয়াম সাধারণত সুস্থ শরীরে বড় সমস্যা তৈরি করে না, কিন্তু সাপ্লিমেন্ট বা ম্যাগনেসিয়ামযুক্ত ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব এবং পেটব্যথার কারণ হতে পারে। কিডনির কার্যক্ষমতা কম থাকলে অতিরিক্ত ম্যাগনেসিয়াম জমে গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
তাই পরীক্ষা বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
চোখের পাতা কাঁপা বা মাঝে মাঝে পেশিতে টান ধরা সব সময় গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ নয়। কিন্তু উপসর্গ বারবার হলে, দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, ক্রমশ বাড়তে থাকলে অথবা তার সঙ্গে অতিরিক্ত দুর্বলতা, অসাড়তা কিংবা হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসক উপসর্গ, খাদ্যাভ্যাস, চলতি ওষুধ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত তথ্য বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করতে পারেন। রক্তে ম্যাগনেসিয়ামের মাত্রা ছাড়াও পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, কিডনির কার্যক্ষমতা বা অন্যান্য বিষয় পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।
নিজে থেকে সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে ঘাটতি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
ম্যাগনেসিয়াম শরীরের পেশি, স্নায়ু, শক্তি উৎপাদন এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর ঘাটতি হলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, পেশিতে টান, অসাড়তা বা ঝিনঝিন করার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে চোখের নিচে কালো দাগ, ত্বকের সমস্যা কিংবা চোখের পাতা কাঁপাকে এককভাবে ম্যাগনেসিয়ামের অভাবের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
প্রতিদিনের খাবারে পুষ্টির বৈচিত্র্য রাখা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করাই সুস্থ থাকার কার্যকর উপায়। শরীরের কোনও লক্ষণকে অবহেলা না করে তার প্রকৃত কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। সঠিক তথ্য, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাই পুষ্টির ঘাটতি প্রতিরোধ ও মোকাবিলার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।