সম্পাদকের কলমে: দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার সঙ্গে যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছিল বাংলার আকাশে-বাতাসে, তা যেন এখনও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। দুর্গাপুজোর বিসর্জন, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আরাধনা—সব মিলিয়ে বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে একের পর এক পালা পেরিয়ে এবার সামনে ছটপুজো ও কালীপুজো। শহর থেকে জেলা, মফস্সল থেকে গ্রামবাংলা—সর্বত্রই উৎসবের প্রস্তুতি, কেনাকাটা, মণ্ডপ সাজানো এবং মানুষের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এই উৎসবগুলি বাংলার সামাজিক জীবন, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলার উৎসব মানেই শুধু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উদ্যাপন নয়। এই রাজ্যের মাটিতে বহু ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরম্পরা পাশাপাশি বেঁচে রয়েছে। দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হলেও, কালীপুজো, ছটপুজো, জগদ্ধাত্রীপুজো, রাসযাত্রা কিংবা বড়দিন—প্রতিটি উৎসবই বাংলার সামাজিক জীবনে নিজস্ব ছাপ রেখে যায়। উৎসবের এই ধারাবাহিকতাই বাংলাকে অন্য রাজ্যের থেকে আলাদা পরিচয় দেয়।
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক মিলনের এক বৃহত্তম উপলক্ষ। নতুন পোশাক, প্যান্ডেল হপিং, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে মিলন—সব মিলিয়ে এই কয়েকটি দিন বাঙালির জীবনে বিশেষ জায়গা করে নেয়। দুর্গাপুজো শেষ হলেও তার রেশ থেকে যায় আরও বেশ কিছু দিন।
এর পর আসে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। ঘরে ঘরে ধন-সম্পদ, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনায় দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করেন বহু পরিবার। বাংলার গ্রামীণ জীবনে এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষি, সংসারের প্রাচুর্য এবং পারিবারিক ঐতিহ্য। লক্ষ্মীপুজোর পরেই উৎসবের পরবর্তী পর্বের দিকে এগিয়ে যায় বাংলা।
এবার সামনে ছটপুজো ও কালীপুজো। একদিকে সূর্যদেবের আরাধনায় ব্রতী হবেন ছটপুজোর উপাসকরা, অন্যদিকে অমাবস্যার রাতে শক্তির আরাধনায় মাতবে কালীপুজো। দুই উৎসবের ধর্মীয় রীতি আলাদা হলেও, উভয়ের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে নিষ্ঠা, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক অংশগ্রহণ।
ছটপুজো মূলত সূর্যদেব ও ছটী মাইয়ার আরাধনাকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসবের বিশেষ গুরুত্ব থাকলেও, দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গেও ছটপুজোর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন শহর, শিল্পাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় বহু মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।
ছটপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কঠোর ব্রত, শুদ্ধাচার এবং সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের সময় জলাশয়ে দাঁড়িয়ে অর্ঘ্য নিবেদন। নদীর ঘাট, পুকুর কিংবা নির্দিষ্ট জলাশয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ। পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন, ব্রতীরা নিয়ম মেনে উপাসনা করেন এবং ঘাটে ঘাটে দেখা যায় ভক্তদের সমাগম।
এই উৎসবকে ঘিরে প্রশাসনের দায়িত্বও কম নয়। জলাশয়ের নিরাপত্তা, ঘাট পরিষ্কার রাখা, পর্যাপ্ত আলো, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যান চলাচল পরিচালনা এবং জরুরি পরিষেবার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত যেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ একত্রিত হন, সেখানে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় উৎসবকে নিরাপদ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ছটপুজোর বিস্তার বাংলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। রাজ্যে বসবাসকারী বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের ধর্মীয় উৎসবও সময়ের সঙ্গে বাংলার বৃহত্তর সামাজিক পরিসরের অংশ হয়ে উঠেছে। এই সহাবস্থানকে সম্মান করা এবং প্রতিটি সম্প্রদায়ের উৎসব পালনের অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আধুনিক বাংলার পরিচয়।
দুর্গাপুজোর পর বাংলার অন্যতম বড় উৎসব কালীপুজো। অমাবস্যার রাতে দেবী কালীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বহু প্রান্তে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, প্রতিমা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে কালীপুজো বাঙালির উৎসব জীবনে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
কলকাতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা শহর, মফস্সল ও গ্রামাঞ্চলে কালীপুজোকে ঘিরে চলে প্রস্তুতি। কোথাও ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক পুজো, কোথাও বড় বারোয়ারি আয়োজন, আবার কোথাও স্থানীয় ক্লাবের উদ্যোগে প্রতিমা ও মণ্ডপ তৈরি হয়। অনেক এলাকায় কালীপুজোর সঙ্গে যুক্ত থাকে দীপাবলির আলোর উৎসবও।
তবে উৎসবের আনন্দ বজায় রাখতে পরিবেশ ও জননিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা, বিদ্যুতের সুরক্ষিত সংযোগ এবং বাজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি মেনে চলা দরকার। উৎসবের আনন্দ যেন অন্যের অসুবিধা বা পরিবেশের ক্ষতির কারণ না হয়, সে বিষয়ে নাগরিকদেরও সচেতন থাকা জরুরি।
বাংলার উৎসবের সৌন্দর্য শুধু কলকাতার বড় মণ্ডপ বা শহরের আলোকসজ্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জেলার শহর, ছোট মফস্সল, শিল্পাঞ্চল এবং প্রত্যন্ত গ্রামেও উৎসবের নিজস্ব রূপ রয়েছে। কোথাও স্থানীয় ক্লাবের উদ্যোগে পুজোর প্রস্তুতি, কোথাও পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে উপাসনা, আবার কোথাও পাড়ার মানুষ একত্রিত হয়ে উৎসবের আয়োজন করেন।
উৎসবের মরশুমে বাজারে বাড়ে কেনাকাটার ব্যস্ততা। পোশাক, ফুল, ফল, মিষ্টি, সাজসজ্জার সামগ্রী, প্রতিমা নির্মাণ এবং আলোকসজ্জার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের জীবিকা এই সময়ের উপর নির্ভরশীল। মণ্ডপ নির্মাণের কারিগর, মৃৎশিল্পী, আলোকশিল্পী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফুল বিক্রেতা, পরিবহণকর্মী এবং অস্থায়ী দোকানদারদের কাছে উৎসবের মরশুম অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণে উৎসব শুধু ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি বড় চালিকাশক্তি। মানুষের কেনাকাটা ও জমায়েতের মধ্য দিয়ে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ে। ফলে উৎসবের প্রস্তুতি ও আয়োজন বহু পরিবারের আয়ের সুযোগ তৈরি করে।
উৎসব যত বড় হয়, প্রশাসনিক প্রস্তুতির প্রয়োজনও তত বাড়ে। ছটপুজোর ক্ষেত্রে জলাশয়ের নিরাপত্তা, কালীপুজোর ক্ষেত্রে মণ্ডপ ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার সুরক্ষা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং যানবাহন চলাচলের পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনের উচিত সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, দমকল, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পুরসভা বা পঞ্চায়েতের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করা। বিপজ্জনক ঘাট চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দেওয়া, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মতো বিষয়গুলিতে বিশেষ নজর প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। জলাশয়ে নামার সময় সতর্কতা অবলম্বন, ভিড়ের মধ্যে শিশুদের নজরে রাখা, বৈদ্যুতিক তার বা অস্থায়ী কাঠামো থেকে দূরে থাকা এবং প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা—এই ছোট ছোট সচেতনতাই বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
উৎসবের আগে প্রশাসনিক তৎপরতা চোখে পড়া অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সেই তৎপরতা যেন শুধু উৎসবের দিনগুলিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক পরিকল্পনা থাকলে উৎসব আরও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
বাংলার রাজনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তন বা নতুন সরকারের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা থাকতেই পারে। কিন্তু উৎসবের সংস্কৃতি কোনও একটি রাজনৈতিক দল বা সরকারের একক সম্পত্তি নয়। দুর্গাপুজো, কালীপুজো, ছটপুজো কিংবা অন্য ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব—সবই মানুষের বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং সম্মিলিত জীবনের সঙ্গে যুক্ত।
রাজনৈতিক পালাবদল প্রশাসনিক অগ্রাধিকার, উৎসব পরিচালনার পদ্ধতি কিংবা সরকারি উদ্যোগে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে উৎসবের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সম্মান এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে। কোনও উৎসবকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক রঙে সীমাবদ্ধ না রেখে সবার অংশগ্রহণের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা জরুরি।
বাংলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে পাশাপাশি উদ্যাপন করে আসছেন। এই ঐতিহ্য বজায় রাখতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয় বা ভাষাগত পার্থক্য যেন বিভেদের কারণ না হয়ে ওঠে, বরং বৈচিত্র্যের মধ্যেই যেন ঐক্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
বাংলার উৎসবের অন্যতম শক্তি হলো বহুত্ব। বাঙালির দুর্গাপুজো যেমন রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তেমনই ছটপুজোও বহু মানুষের জীবনের গভীর বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। কালীপুজো, দীপাবলি এবং অন্যান্য উৎসবও নানা সম্প্রদায়ের মানুষকে একত্রিত করে।
এই সহাবস্থানকে শুধু উৎসবের দিনগুলিতে স্মরণ করলেই চলবে না; দৈনন্দিন জীবনেও তা বজায় রাখা প্রয়োজন। একে অপরের বিশ্বাসকে সম্মান করা, উৎসব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং কোনও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো থেকে বিরত থাকা—এগুলিই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি।
উৎসবের সময় একে অপরের আনন্দে শামিল হওয়া, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো এবং বিপন্ন মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা বাংলার সামাজিক ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। ধর্মীয় উৎসবের বাইরেও মানবিকতা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই হওয়া উচিত সমাজের প্রধান পরিচয়।
দুর্গাপুজো শেষ, লক্ষ্মীপুজোর পর্বও পেরিয়ে বাংলা এখন ছটপুজো ও কালীপুজোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। এই ধারাবাহিক উৎসব বাংলার সামাজিক জীবনের প্রাণশক্তিকে তুলে ধরে। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্র মানুষের ব্যস্ততা, বাজারের চাঞ্চল্য এবং পুজোর আয়োজন প্রমাণ করে যে উৎসব এখনও মানুষের জীবনে আনন্দ ও মিলনের বড় উপলক্ষ।
কিন্তু উৎসবের সার্থকতা শুধু আলোকসজ্জা, বড় মণ্ডপ বা জনসমাগমে নয়। তার সার্থকতা রয়েছে নিরাপত্তায়, পরিচ্ছন্নতায়, পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধে এবং সব সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মানে। প্রশাসনকে যেমন প্রস্তুত থাকতে হবে, তেমনই নাগরিকদেরও সচেতন ভূমিকা নিতে হবে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক, বাংলার উৎসব যেন কোনও বিভাজনের হাতিয়ার না হয়। বাঙালি ও অবাঙালি, শহর ও গ্রাম, ধনী ও দরিদ্র—সবাই যেন নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে উৎসব পালন করতে পারেন। যে বাংলার পরিচয় তার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সেই বাংলার শক্তি নিহিত রয়েছে সহাবস্থানে।
উৎসব আসুক, আনন্দ ছড়াক। প্রশাসনিক প্রস্তুতি থাকুক, পরিবেশ রক্ষা হোক, আর মানুষের মধ্যে অটুট থাকুক সম্প্রীতি। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা সত্ত্বেও সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলুক বাংলা—এটাই হোক উৎসবের মরশুমে আমাদের প্রত্যাশা।