নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: শিম, ডাল, চর্বিযুক্ত মাছ, বাদাম, ফল এবং পূর্ণ শস্য—এই পরিচিত খাবারগুলিই হতে পারে হৃদ্স্বাস্থ্যের বন্ধু। দামি কোনও বিশেষ ডায়েট নয়, বরং প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তন এনে কমানো যেতে পারে হৃদরোগের ঝুঁকি।
হৃদযন্ত্র আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রতিদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে রক্ত পাম্প করে শরীরের প্রতিটি অংশে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয় এই অঙ্গ। অথচ অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি, অস্বাস্থ্যকর চর্বি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং ধূমপানের মতো অভ্যাস হৃদযন্ত্রের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে শুধু নিয়মিত ব্যায়াম নয়, প্রতিদিনের খাবারের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খাদ্যতালিকায় শিম, মটরশুঁটি, ডাল, চর্বিযুক্ত মাছ, বাদাম, ফল এবং পূর্ণ শস্যের মতো পুষ্টিকর খাবার রাখা যেতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের খাদ্যসংক্রান্ত নির্দেশিকাতেও একটি নির্দিষ্ট খাবারের উপর নির্ভর না করে সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শিম, মটরশুঁটি, ছোলা, মসুর ডাল এবং অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলিতে রয়েছে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, খাদ্যআঁশ এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান।
ডালের দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি ডালজাতীয় খাবার দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমানো এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও সহজ হতে পারে।
প্রতিদিনের খাবারে মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলার তরকারি, রাজমা কিংবা মটরশুঁটির মতো খাবার রাখা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত তেল, ঘি ও লবণ দিয়ে রান্না করলে খাবারের স্বাস্থ্যকর গুণ অনেকটাই কমে যেতে পারে।
মাছ বাঙালির খাদ্যতালিকার পরিচিত অংশ। বিশেষ করে তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত মাছে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান।
স্যামন, সার্ডিন, ম্যাকারেল, হেরিংয়ের মতো মাছে ওমেগা-৩ বেশি থাকে। ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসে সামুদ্রিক তৈলাক্ত মাছের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পাওয়া কিছু মাছও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। মাছের পুষ্টিগুণ বজায় রাখতে অতিরিক্ত তেলে ডুবিয়ে ভাজার বদলে ঝোল, বেক, গ্রিল বা কম তেলে রান্না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন নিয়মিত মাছ ও সামুদ্রিক খাবার খাওয়ার উপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে মাছ খাওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার অন্যান্য দিকও গুরুত্বপূর্ণ।
আখরোট, কাঠবাদাম, চিনাবাদাম এবং অন্যান্য বাদামে রয়েছে অসম্পৃক্ত ফ্যাট, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থ। পরিমিত পরিমাণে বাদাম খাওয়া হৃদ্স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
বিশেষ করে বাদামের অসম্পৃক্ত ফ্যাট, স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে গ্রহণ করলে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে বাদামে ক্যালোরি বেশি থাকায় পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি।
প্রতিদিন অল্প পরিমাণে লবণবিহীন বাদাম খাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত নুন, চিনি বা মশলা মেশানো প্যাকেটজাত বাদাম নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলাই ভালো।
হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন রঙের ফল রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আপেল, কমলালেবু, পেয়ারা, কলা, পেঁপে, বেরি এবং অন্যান্য মৌসুমি ফলে রয়েছে ভিটামিন, খনিজ ও খাদ্যআঁশ।
ফলের খাদ্যআঁশ হজমে সাহায্য করে এবং সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কিছু ফলে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কিডনির রোগ বা রক্তে পটাশিয়ামের সমস্যা থাকলে কোন ফল কতটা খাওয়া যাবে, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ফলের রসের বদলে গোটা ফল খাওয়া বেশি ভালো। কারণ গোটা ফলে খাদ্যআঁশ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং সাধারণত পেট ভরার অনুভূতিও বেশি হয়। WHO-র নির্দেশিকায় ১০ বছরের বেশি বয়সিদের প্রতিদিন অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি গ্রহণের লক্ষ্য রাখার কথা বলা হয়েছে।
সাদা চাল, ময়দা বা অতিরিক্ত পরিশোধিত শস্যের পরিবর্তে খাদ্যতালিকায় পূর্ণ শস্য রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। ওটস, লাল চাল, আটার রুটি, বার্লি এবং অন্যান্য সম্পূর্ণ শস্যে খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে।
পূর্ণ শস্য হজমের গতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। খাদ্যআঁশের কারণে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও কিছু পূর্ণ শস্য উপকারী হতে পারে।
বাঙালি খাদ্যাভ্যাসে একেবারে সাদা চাল বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণের ভারসাম্য রেখে মাঝে মাঝে লাল চাল, ওটস বা আটার রুটি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। মূল লক্ষ্য হল খাদ্যতালিকায় পরিশোধিত শস্যের বদলে বেশি পরিমাণে পূর্ণ শস্য রাখা।
হৃদ্স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে শুধু কোন খাবার খাচ্ছেন তা নয়, কীভাবে রান্না করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ঘি, মাখন, বনস্পতি, ডালডা এবং স্যাচুরেটেড বা ট্রান্স ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাওয়া কমানো উচিত।
তার পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে সয়াবিন, সর্ষে, সূর্যমুখী বা অন্যান্য উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। খাবার ভাজার বদলে সেদ্ধ, ঝোল, স্টিম বা কম তেলে রান্নার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্দেশিকায় স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে অসম্পৃক্ত ফ্যাট গ্রহণ এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হৃদযন্ত্রের যত্ন নিতে শুধু উপকারী খাবার বাড়ালেই হবে না, কিছু খাবারের পরিমাণও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
অতিরিক্ত লবণ: বেশি লবণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। রান্নায় এবং প্যাকেটজাত খাবারে লবণের পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি।
অতিরিক্ত চিনি: মিষ্টি পানীয়, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার সীমিত করা উচিত।
প্রক্রিয়াজাত মাংস: সসেজ, বেকন এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত মাংস নিয়মিত খাওয়া এড়ানো ভালো।
অতিরিক্ত ভাজাভুজি: ডুবো তেলে ভাজা খাবার ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কমানো উচিত।
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার: চিপস, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ইনস্ট্যান্ট খাবার এবং অতিরিক্ত সংযোজিত উপাদানযুক্ত খাবার সীমিত করা ভালো।
WHO-ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর পরামর্শ দিয়েছে।
হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য একদিনে সম্পূর্ণ খাদ্যাভ্যাস বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
সকালের খাবারে ওটস, ফল বা আটার রুটি রাখা যেতে পারে। দুপুরে ভাতের সঙ্গে ডাল, সবজি এবং মাছ খাওয়া যেতে পারে। বিকেলে বিস্কুট বা অতিরিক্ত ভাজাভুজির পরিবর্তে অল্প পরিমাণে লবণবিহীন বাদাম ও একটি গোটা ফল বেছে নেওয়া যেতে পারে। রাতের খাবারে সবজি, ডাল, মাছ অথবা অন্য কোনও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের সঙ্গে পরিমিত পরিমাণে পূর্ণ শস্য রাখা যেতে পারে।
এটি কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসামূলক ডায়েট নয়; বরং সাধারণভাবে হৃদ্স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের একটি উদাহরণ। ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনও দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা থাকলে খাদ্যতালিকা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিক করা উচিত।
শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার খেলেই হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর হয় না। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান থেকে দূরে থাকাও জরুরি।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপের লক্ষ্য রাখা যেতে পারে। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতার তার উদাহরণ। পাশাপাশি রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
যাঁদের পরিবারে অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, অথবা যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা উচ্চ কোলেস্টেরল রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঝুঁকি মূল্যায়ন করা উচিত।
হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখার জন্য কোনও একটি বিশেষ খাবারকে অলৌকিক সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। শিম, ডাল, মাছ, বাদাম, ফল এবং পূর্ণ শস্য—প্রতিটি খাবারই একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে উপকারী হতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মূল পরামর্শ হল, অল্প সময়ের জন্য কঠোর ডায়েট না করে দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা। পরিচিত ও সহজলভ্য খাবার দিয়েই সেই অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। তাই হৃদযন্ত্রের যত্ন নেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে আজকের খাবারের থালায় একটু বেশি ডাল, সবজি, ফল এবং পূর্ণ শস্য যোগ করা।