নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের আগে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলে শুরু হয়েছে নতুন করে হিসাব-নিকাশ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর এবার দলের ব্যাটিং বিভাগ, বিশেষ করে টপ-অর্ডার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আসন্ন WTC27 সিরিজকে সামনে রেখে দলের ব্যাটিং লাইনআপে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকরা। এই পরিস্থিতিতে দলের অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও জানিয়েছেন, দলের বর্তমান পারফরম্যান্স এবং খেলোয়াড়দের নির্বাচন নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সিরিজ জয়ের সুযোগ হাতছাড়া করার পর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং নিয়ে সমালোচনা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে শেষ টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে মাত্র ১১১ রানে অলআউট হয়ে যাওয়া দলের দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করতে চাইছে অস্ট্রেলিয়া।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের শুরুটা ভালোভাবেই করেছিল অস্ট্রেলিয়া। প্রথম টেস্টে বড় ব্যবধানে জয় পেলেও পরবর্তী দুটি ম্যাচে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ও ৩১ রানে পরাজয়ের পর কেপটাউনের তৃতীয় টেস্টেও ১৭৬ রানে হেরে যায় অস্ট্রেলিয়া। ফলে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা।
শেষ টেস্টে জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সামনে লক্ষ্য ছিল ২৮৮ রান। কিন্তু রান তাড়া করতে নেমে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দলটি। একের পর এক উইকেট হারিয়ে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১১১ রানে অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।
এই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার কাগিসো রাবাডা এবং স্পিনার সাইমন হারমারের বোলিংয়ের সামনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা প্রত্যাশিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। বিশেষ করে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রক্ষণাত্মক খেলার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ অধিনায়ক প্যাট কামিন্স।
ম্যাচের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কামিন্স স্বীকার করেছেন, দলের ব্যাটাররা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতে, পঞ্চম দিনের পিচ কঠিন হলেও সেখানে রান করার সুযোগ ছিল। কিন্তু ব্যাটাররা যথেষ্ট ধৈর্য দেখাতে পারেননি।
কামিন্সের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, প্রত্যেক ব্যাটারের পরিকল্পনা একরকম ছিল না। স্পিনার সাইমন হারমারের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হওয়ার পরিবর্তে আরও কিছু সময় রক্ষণাত্মকভাবে খেলা উচিত ছিল।
তিনি মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উইকেট ধরে রাখা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করার ক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে শুধু ভালো শট খেললেই হয় না, দীর্ঘ সময় ধরে চাপ সামলে উইকেটে টিকে থাকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পরপর দুটি টেস্টে পরাজয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে টপ-অর্ডারের কয়েকজন ব্যাটারের ধারাবাহিক ব্যর্থতা নির্বাচকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
কামিন্স জানিয়েছেন, পরপর দুটি ম্যাচ হারার পর দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। দলের অভ্যন্তরেও এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের ধরন কিংবা খেলোয়াড় নির্বাচনে পরিবর্তন আসতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঠিক কোন খেলোয়াড় বাদ পড়বেন বা কারা সুযোগ পাবেন, সে বিষয়ে তিনি কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি।
অস্ট্রেলিয়ার টপ-অর্ডার নিয়ে আলোচনায় উঠে আসছে মার্নাস লাবুশেনের নামও। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজে তাঁর ব্যাটিং প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। শেষ টেস্টের দুই ইনিংসে তিনি করেন মাত্র ০ এবং ৪ রান।
দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত লাবুশেনের কাছ থেকে আরও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করছে দল। ফলে নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে তাঁর জায়গা নিয়ে নির্বাচকদের আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে স্টিভ স্মিথের ফিটনেস ও প্রত্যাবর্তনও দলের ব্যাটিং পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তাঁর উপস্থিতি টপ-অর্ডার ও মিডল-অর্ডারের ভারসাম্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার দলে কয়েকজন তরুণ এবং নতুন খেলোয়াড় ইতিমধ্যেই নিজেদের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ পেয়েছেন। কুপার কনোলি, জশ ইংলিস এবং ম্যাট কুনেম্যানের মতো ক্রিকেটারদের নিয়ে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তৈরি হচ্ছে।
কামিন্সের মতে, দলের বাইরে এমন বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার রয়েছেন, যাঁরা সুযোগ পেলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণ করতে পারবেন। তাই নির্বাচকদের সামনে বিকল্পের অভাব নেই।
নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া হবে কি না, সেটি নির্ভর করবে তাঁদের বর্তমান ফর্ম, দলের প্রয়োজন এবং নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের পরিস্থিতির উপর।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজ হার অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অবস্থানেও প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি আইসিসি টেস্ট দলের র্যাঙ্কিংয়েও তারা শীর্ষস্থান হারিয়েছে।
এবার ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আসন্ন টেস্ট সিরিজে ঘুরে দাঁড়ানোই অস্ট্রেলিয়ার প্রধান লক্ষ্য। এই সিরিজে ব্যাটিং বিভাগের উন্নতি, টপ-অর্ডারের ধারাবাহিকতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিউজিল্যান্ডের বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার ও তিন নম্বরে ব্যাট করা খেলোয়াড়দের বড় ভূমিকা নিতে হবে। শুরুতেই উইকেট হারালে মিডল-অর্ডারের উপর চাপ বাড়বে। তাই দলের প্রথম ছয় ব্যাটারের সমন্বয় নিয়ে নির্বাচকদের বিশেষভাবে ভাবতে হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজ হারের পর অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ। অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের বক্তব্যে স্পষ্ট, দলের ব্যাটিং পারফরম্যান্স এবং খেলোয়াড় নির্বাচনের বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে।
তবে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে অস্ট্রেলিয়া ঠিক কোন ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে মাঠে নামবে, সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। নির্বাচকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই এখন নজর ক্রিকেটপ্রেমীদের।