নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: সরকারি কর্মীদের উপর হামলা এবং Form 7 পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে নতুন করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের দাবি রাজ্য বিজেপি সভাপতির। তাঁর বক্তব্য, বাধা ও হুমকির ঘটনা না ঘটলে ভোটার তালিকা থেকে আরও বহু ভুয়ো ও অযোগ্য নাম বাদ দেওয়া সম্ভব হত।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন করে জোরদার হল। রাজ্যে পুনরায় SIR করার দাবি তুললেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে যে SIR প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ও বাধাহীনভাবে করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভোটার তালিকা থেকে আরও বহু ভুয়ো ও অযোগ্য নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ থেকে গিয়েছে। প্রকৃত ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে রাজ্যে নতুন করে SIR হওয়া প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন তিনি।
শনিবার, ৩১ অক্টোবর কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শমীক ভট্টাচার্য বলেন, দলের পক্ষ থেকে তাঁরা স্পষ্টভাবে জানাতে চান যে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে SIR করা দরকার। তাঁর অভিযোগ, SIR-এর কাজে নিযুক্ত সরকারি কর্মীদের উপর হামলা, হুমকি এবং নথি পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা না ঘটলে ভোটার তালিকা আরও ভালোভাবে সংশোধন করা সম্ভব হত। <Cite refs={["turn811205search0","turn811205search1","turn811205search2"]}/>
শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া হয়েছে, তা তাঁর দলের মতে অসম্পূর্ণ। তাঁর অভিযোগ, সংশোধনের কাজে যুক্ত সরকারি কর্মীদের একাংশকে বাধা ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। ব্লক স্তরের আধিকারিক থেকে শুরু করে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং বিজেপির বুথ স্তরের প্রতিনিধিদেরও হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
বিজেপি রাজ্য সভাপতির বক্তব্য, এই ধরনের ঘটনা না ঘটলে ভোটার তালিকা থেকে আরও বেশি সংখ্যক ভুয়ো ও অযোগ্য নাম বাদ দেওয়া যেত। তাঁর মতে, ভোটার তালিকা নির্ভুল হওয়া গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অন্যতম শর্ত। তাই কোনও রাজনৈতিক বাধা বা ভয়ভীতির পরিবেশ ছাড়া এই কাজ সম্পন্ন হওয়া জরুরি।
SIR নিয়ে নিজের বক্তব্যের সমর্থনে Form 7 পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে ব্যবহৃত নথি নিয়ে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং কিছু নথি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি কর্মীদের উপর হামলা ও বিজেপির বুথ স্তরের প্রতিনিধিদের হেনস্থার অভিযোগও করেছেন তিনি।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় Form 7 গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি। ভোটার তালিকায় কোনও নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো বা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করতে এই ফর্ম ব্যবহৃত হয়। ফলে এই ফর্ম বা সংশ্লিষ্ট নথি নিয়ে কোনও অনিয়ম বা বাধার অভিযোগ উঠলে তা নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তবে Form 7 পুড়িয়ে দেওয়া এবং সরকারি কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগগুলি শমীক ভট্টাচার্য ও বিজেপির বক্তব্য হিসেবেই সামনে এসেছে। প্রতিটি ঘটনার স্থান, সময়, দায়ী ব্যক্তি এবং প্রশাসনিক তদন্তের ফল আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বুথ স্তরের আধিকারিক, ব্লক স্তরের প্রশাসনিক কর্মী এবং অন্যান্য সরকারি কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কাজের মধ্যে রয়েছে ভোটারদের তথ্য যাচাই, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ এবং সংশোধনের আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা।
এই কাজের সময় কর্মীরা যদি রাজনৈতিক চাপ, হুমকি বা হিংসার মুখে পড়েন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। শমীক ভট্টাচার্য এই বিষয়টিকেই সামনে এনে বলেছেন, সরকারি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরির কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তাঁর দাবি, নতুন করে SIR হলে এবার যাতে কোনও কর্মীকে হুমকি বা হামলার মুখে পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভোটার তালিকায় প্রকৃত ভোটারদের নাম অক্ষুণ্ণ রেখে অযোগ্য নাম শনাক্ত করার কাজও নিরপেক্ষভাবে করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে SIR প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়েছিল। শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, প্রক্রিয়াটি বাধাহীনভাবে সম্পন্ন হলে আরও বেশি সংখ্যক অযোগ্য নাম বাদ দেওয়া সম্ভব হত।
তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অর্থ সব ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভুয়ো ভোটার—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক স্থানে নাম থাকা বা অন্য কারণে অযোগ্য হয়ে পড়া ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার পাশাপাশি কোনও যোগ্য নাগরিকের নাম ভুল করে বাদ পড়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি। তাই SIR-এর সাফল্য বিচার করতে হলে শুধু কত নাম বাদ পড়েছে, তা নয়; কতজন প্রকৃত ভোটারের নাম তালিকায় রয়ে গিয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
SIR প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে আগে থেকেই মতবিরোধ রয়েছে। বিরোধী দলগুলির একাংশের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র, পরিযায়ী শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং নথিপত্রের সমস্যায় থাকা মানুষের ভোটাধিকার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।
অন্যদিকে শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় অযোগ্য নাম থেকে গেলে প্রকৃত ভোটারদের অধিকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই তাঁর মতে, SIR বন্ধ করার দাবি না তুলে বরং প্রক্রিয়াটিকে আরও নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার দিকে নজর দেওয়া উচিত।
রাজ্যে নতুন করে SIR করার দাবি বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। প্রথমত, ভোটার তালিকায় থাকা প্রতিটি নামের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোনও যোগ্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আগে তাঁকে যথাযথভাবে নোটিস ও বক্তব্য জানানোর সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, সরকারি কর্মীদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের উপর কোনও ধরনের রাজনৈতিক চাপ যাতে না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ছাড়াও ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, আপত্তি ও আবেদনের নিষ্পত্তি দ্রুত করা এবং বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সহজ ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। কারণ ভোটার তালিকা নির্ভুল করার লক্ষ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই একজন যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার রক্ষা করাও সমান জরুরি।
শমীক ভট্টাচার্যের এই বক্তব্যের ফলে পশ্চিমবঙ্গে SIR নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়তে পারে। বিজেপি রাজ্য নেতৃত্বের দাবি, আগের প্রক্রিয়ায় বাধা ও হিংসার অভিযোগের যথাযথ পর্যালোচনা করে নতুন করে সংশোধনের ব্যবস্থা করা দরকার। অন্যদিকে বিরোধীদের কাছে প্রধান উদ্বেগ হল, নতুন কোনও প্রক্রিয়ায় যেন প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ না পড়ে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে পুনরায় SIR করার দাবি ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করেছেন, তাঁর দলের মতে আগের SIR অসম্পূর্ণ ছিল এবং প্রকৃত ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে নতুন করে এই প্রক্রিয়া হওয়া প্রয়োজন। এখন দেখার, এই দাবির পর নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনের তরফে কী পদক্ষেপ করা হয় এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক কোন দিকে এগোয়।