নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: মাত্র ১১টি পুশ-আপ! সংখ্যাটা শুনতে খুব বেশি মনে না হলেও, একটানা সঠিক পদ্ধতিতে এই ব্যায়াম করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন বহু মানুষ। মেল রবিন্সের পডকাস্টে অর্থোপেডিক সার্জন ডঃ ভন্ডা রাইটের পরামর্শ থেকেই জনপ্রিয় হয়েছে এই চ্যালেঞ্জ। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন অনেকেই নিজেদের শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করতে নেমে পড়েছেন এই পরীক্ষায়।
আপনি একটানা কতগুলি পুশ-আপ করতে পারেন? পাঁচটি, দশটি, নাকি অনায়াসে ১১টি? সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই প্রশ্ন ঘিরেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘১১ পুশ-আপ চ্যালেঞ্জ’। বিশেষ করে মহিলাদের শারীরিক সক্ষমতা, পেশির শক্তি এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত শরীরচর্চার গুরুত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ।
এই চ্যালেঞ্জের জনপ্রিয়তার পিছনে রয়েছে লেখক ও পডকাস্ট সঞ্চালক মেল রবিন্সের অনুষ্ঠান। তাঁর পডকাস্টে অর্থোপেডিক সার্জন এবং দীর্ঘায়ু ও পেশি-হাড়ের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডঃ ভন্ডা রাইট বলেছিলেন, প্রত্যেক মহিলার লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্তত ১১টি সাধারণ পুশ-আপ করতে পারা। হাঁটু মাটিতে রেখে নয়, বরং পায়ের আঙুলের ভর দিয়ে সম্পূর্ণ পুশ-আপ করার কথা বলেন তিনি। সেই কথোপকথনের ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়তেই বহু মানুষ নিজেদের সক্ষমতা পরীক্ষা করতে শুরু করেন।
মেল রবিন্সের পডকাস্টে ডঃ ভন্ডা রাইটের সঙ্গে আলোচনার সময় উঠে আসে মহিলাদের শারীরিক শক্তি ও বয়সজনিত পেশিক্ষয়ের প্রসঙ্গ। ডঃ রাইটের বক্তব্য ছিল, শরীরের নিজের ওজন সামলানোর মতো শক্তি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই সক্ষমতা যাচাই করার একটি সহজ উপায় হতে পারে পুশ-আপ।
কথোপকথনের সময় মেল রবিন্স জানতে চান, হাঁটু মাটিতে রেখে পুশ-আপ করলে চলবে কি না। উত্তরে ডঃ রাইট জানান, তাঁর বলা ১১টি পুশ-আপের লক্ষ্যটি সাধারণ বা পূর্ণ পুশ-আপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে যাঁরা এখনই তা করতে পারবেন না, তাঁদের জন্য দেয়াল বা উঁচু টেবিলের সাহায্যে শুরু করার পরামর্শও দেওয়া হয়।
এই কথোপকথনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর বহু মানুষ নিজেদের পুশ-আপ করার ভিডিও পোস্ট করেন। কেউ সহজেই ১১টি করতে পেরেছেন, আবার কেউ একটি বা দু’টি করতেই সমস্যায় পড়েছেন। ফলে চ্যালেঞ্জটি শুধু শরীরচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবার একটি সামাজিক মাধ্যমের প্রবণতায় পরিণত হয়েছে।
পুশ-আপ এমন একটি ব্যায়াম, যেখানে নিজের শরীরের ওজন ব্যবহার করে একাধিক পেশিকে একসঙ্গে সক্রিয় করতে হয়। বুক, কাঁধ, বাহু, পেট এবং শরীরের মাঝের অংশের পেশি এই ব্যায়ামের সময় কাজ করে। সঠিক পদ্ধতিতে পুশ-আপ করলে শরীরের উপরিভাগের শক্তি, পেশির সহনশীলতা এবং শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির শক্তি ও কার্যক্ষমতা কমতে পারে। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে মধ্যবয়স ও মেনোপজের সময় পেশি এবং হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়তি সচেতনতা জরুরি। নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখতে এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম সহজ করতে সহায়তা করতে পারে।
পুশ-আপের আরেকটি সুবিধা হল, এটি করতে বিশেষ কোনও যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। বাড়ির মেঝে, দেয়াল কিংবা মজবুত টেবিলের সাহায্যেই বিভিন্ন স্তরে এই ব্যায়াম করা সম্ভব।
১১ পুশ-আপ চ্যালেঞ্জ জনপ্রিয় হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১১ সংখ্যাটি সবার জন্য কোনও সর্বজনীন স্বাস্থ্যমান নয়। মানুষের বয়স, শারীরিক গঠন, ওজন, পূর্ববর্তী ব্যায়ামের অভ্যাস, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং পেশির সক্ষমতা অনুযায়ী পুশ-আপ করার ক্ষমতা আলাদা হতে পারে।
‘হেলথ’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন বয়সের মহিলাদের পুশ-আপ করার সক্ষমতার গড়ও এক নয়। বিশের কোঠা, তিরিশ, চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশের বয়সে শারীরিক সক্ষমতার স্বাভাবিক পার্থক্য থাকে। তাই ১১টি পুশ-আপ করতে না পারলেই কেউ অসুস্থ বা দুর্বল—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা না করে নিজের বর্তমান সক্ষমতা বুঝে ব্যায়াম শুরু করা উচিত। আজ যদি একটি পুশ-আপও করা সম্ভব না হয়, তাতেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে শক্তি বাড়ানোই আসল লক্ষ্য।
যাঁরা পূর্ণ পুশ-আপ করতে অভ্যস্ত নন, তাঁদের জন্য কয়েকটি সহজ ধাপ অনুসরণ করা যেতে পারে।
প্রথম ধাপ: দেয়ালের সাহায্যে পুশ-আপ
দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত কাঁধের সমান দূরত্বে রাখুন। ধীরে ধীরে বুক দেয়ালের দিকে নিয়ে যান এবং আবার হাতের সাহায্যে শরীর পিছনে ঠেলে দিন। এটি নতুনদের জন্য তুলনামূলক সহজ একটি পদ্ধতি।
দ্বিতীয় ধাপ: উঁচু টেবিল বা মজবুত কাউন্টারের সাহায্য
দেয়ালের ব্যায়াম সহজ হয়ে গেলে মজবুত টেবিল বা উঁচু কোনও স্থানে হাত রেখে পুশ-আপের অনুশীলন করা যায়। এতে শরীরের উপরিভাগের পেশির উপর ধীরে ধীরে চাপ বাড়ে।
তৃতীয় ধাপ: হাঁটু মাটিতে রেখে অনুশীলন
পরবর্তী পর্যায়ে হাঁটু মাটিতে রেখে পুশ-আপ করা যেতে পারে। এতে পূর্ণ পুশ-আপের তুলনায় শরীরের ওজনের কম অংশ হাতের উপর পড়ে।
চতুর্থ ধাপ: পূর্ণ পুশ-আপের চেষ্টা
যথেষ্ট শক্তি তৈরি হলে পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে শরীর সোজা রেখে পূর্ণ পুশ-আপের চেষ্টা করা যায়। প্রথমে এক বা দুটি সঠিক পুশ-আপ করাই লক্ষ্য হতে পারে। পরে ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।
পুশ-আপ দেখতে সহজ মনে হলেও ভুল পদ্ধতিতে করলে কাঁধ, কবজি, কনুই কিংবা পিঠে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। ব্যায়ামের সময় মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত শরীর যতটা সম্ভব সোজা রাখতে হবে। পেটের পেশি শক্ত রাখতে হবে এবং বুক ধীরে ধীরে মেঝের দিকে নামাতে হবে। কনুই শরীর থেকে অতিরিক্ত বাইরে ছড়িয়ে না দিয়ে স্বাভাবিক কোণে রাখা উচিত।
দ্রুত অনেকগুলি পুশ-আপ করার চেয়ে সঠিক ভঙ্গিতে অল্প সংখ্যক পুশ-আপ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক শারীরিক অস্বস্তি হলে ব্যায়াম বন্ধ করা উচিত। যাঁদের আগে থেকেই কাঁধ, কবজি বা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
‘১১ পুশ-আপ চ্যালেঞ্জ’-এর জনপ্রিয়তা দেখিয়ে দিয়েছে, একটি ছোট ভিডিও বা একটি সহজ প্রশ্নও মানুষকে শরীরচর্চার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে। তবে এই প্রবণতার মূল উদ্দেশ্য যেন শুধু ১১ সংখ্যায় পৌঁছনো না হয়। বরং নিজের শরীরকে আরও শক্তিশালী করা, নিয়মিত নড়াচড়া করা এবং বয়স বাড়লেও দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ধরে রাখাই হওয়া উচিত আসল লক্ষ্য।
মেল রবিন্সের পডকাস্টে উঠে আসা ডঃ ভন্ডা রাইটের পরামর্শকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই চ্যালেঞ্জ এখন বহু মানুষের কাছে নিজেদের ফিটনেস যাচাইয়ের একটি মজার উপায়। তবে মনে রাখতে হবে, শরীরচর্চায় কোনও একটিমাত্র সংখ্যা সবার সুস্থতার মাপকাঠি হতে পারে না।
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘আপনি ১১টি পুশ-আপ করতে পারেন কি না’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আপনি কি নিজের শরীরের যত্ন নিতে নিয়মিত সময় দিচ্ছেন? নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী আজ থেকেই কি একটু একটু করে শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন? সুস্থ থাকার দীর্ঘ যাত্রায় এই অভ্যাসগুলিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।