নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: শরীর সুস্থ রাখতে প্রোটিনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেশি গঠন, শরীরের কোষের মেরামতি এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার সাহায্য করে। তবে শুধু প্রোটিনের পরিমাণ বেশি হলেই কোনও খাবার স্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে না। হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে খাবারে প্রোটিনের পাশাপাশি ফাইবার, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের ভারসাম্য থাকাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, বাদাম, বীজ, ডাল, মাছ এবং কম ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পাশাপাশি অতিরিক্ত নুন, স্যাচুরেটেড ফ্যাট, চিনি এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস কমানো প্রয়োজন। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের খাদ্যসংক্রান্ত নির্দেশিকাতেও কোনও একটি খাবারের বদলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রোটিনসমৃদ্ধ স্ন্যাকসের তালিকায় প্রথমেই রাখা যায় চিনি ছাড়া সাধারণ গ্রিক দই। এতে প্রোটিনের পাশাপাশি ক্যালসিয়ামও থাকে। এর সঙ্গে স্ট্রবেরি, আপেল, পেয়ারা বা অন্য কোনও তাজা ফল মিশিয়ে খেলে খাবারে ফাইবার ও বিভিন্ন উপকারী পুষ্টি উপাদান যোগ হয়।
কেন উপকারী: কম ফ্যাটযুক্ত, চিনি ছাড়া দই বেছে নিলে অপ্রয়োজনীয় স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনি কম খাওয়া যায়। তবে ফলের স্বাদযুক্ত প্যাকেটজাত দই কেনার আগে তাতে কতটা চিনি রয়েছে, তা দেখে নেওয়া জরুরি।
বাঙালির পরিচিত খাবার ছোলা হতে পারে সহজলভ্য ও পুষ্টিকর স্ন্যাকস। সেদ্ধ ছোলায় উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের পাশাপাশি ফাইবার থাকে। সামান্য লেবুর রস, শসা, টমেটো ও ধনেপাতা দিয়ে মাখিয়ে খেলে এটি আরও সুস্বাদু হয়।
কেন উপকারী: ডালজাতীয় খাবারের ফাইবার পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। খাদ্যতালিকায় নিয়মিত ছোলা, মটরশুঁটি ও অন্যান্য ডাল রাখলে হৃদযন্ত্রের উপযোগী খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সুবিধা হয়।
তবে ছোলা মাখার সময় অতিরিক্ত নুন, চানাচুর বা বেশি তেল ব্যবহার না করাই ভালো।
কাজের ফাঁকে বা বিকেলের খিদে মেটাতে কাঠবাদাম, আখরোট ও পেস্তা ভালো বিকল্প হতে পারে। বাদামে প্রোটিনের পাশাপাশি অসম্পৃক্ত ফ্যাট থাকে। আখরোটে উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও পাওয়া যায়।
কেন উপকারী: স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে বাদামের মতো অসম্পৃক্ত ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া হৃদযন্ত্রের পক্ষে সহায়ক হতে পারে। তবে বাদামে ক্যালরির পরিমাণ বেশি, তাই একবারে অল্প পরিমাণ খাওয়াই ভালো।
নুন দেওয়া, চিনি মাখানো বা অতিরিক্ত তেলে ভাজা বাদামের বদলে সাধারণ বা নুনবিহীন বাদাম বেছে নিন।
সহজে তৈরি করা যায় বলে সেদ্ধ ডিম অনেকেরই পছন্দের স্ন্যাকস। একটি বড় ডিমে সাধারণত প্রায় ৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে। ডিমে ভিটামিন বি১২, কোলিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানও পাওয়া যায়।
কেন উপকারী: ডিম সহজলভ্য প্রোটিনের উৎস। তবে ডিম কীভাবে খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত মাখন, তেল, নুন বা প্রক্রিয়াজাত মাংসের সঙ্গে খাওয়ার বদলে সেদ্ধ ডিমের সঙ্গে শসা, টমেটো বা অন্য সবজি রাখা যেতে পারে।
যাঁদের কোলেস্টেরল বেশি বা চিকিৎসক ডিমের কুসুম সীমিত রাখতে বলেছেন, তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করা উচিত।
এডামামে হল কচি সয়াবিন, যা সেদ্ধ করে সহজেই খাওয়া যায়। এতে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, ফাইবার এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থ থাকে। হালকা সেদ্ধ করে সামান্য লেবুর রস ও মশলা দিয়ে এটি পরিবেশন করা যায়।
কেন উপকারী: সয়াবিনজাত খাবার উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ভালো উৎস। মাংস বা অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবারের পরিবর্তে ডাল, সয়াবিন ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিন বেছে নেওয়া হৃদযন্ত্রের উপযোগী খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
তবে সয়া থেকে অ্যালার্জি থাকলে এই খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
হুমাস সাধারণত ছোলা, তিলের পেস্ট, লেবুর রস ও সামান্য তেল দিয়ে তৈরি করা হয়। গাজর, শসা, ক্যাপসিকাম বা অন্যান্য কাঁচা সবজির সঙ্গে এটি খাওয়া যায়।
কেন উপকারী: ছোলা থেকে প্রোটিন ও ফাইবার পাওয়া যায়, আর তিল ও উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ তেল থেকে কিছু স্বাস্থ্যকর ফ্যাট মেলে। সবজির সঙ্গে খেলে স্ন্যাকসটিতে আরও ফাইবার ও বিভিন্ন ভিটামিন যুক্ত হয়।
বাজার থেকে তৈরি হুমাস কিনলে তাতে নুন ও তেলের পরিমাণ দেখে নেওয়া উচিত। বাড়িতে তৈরি করার সময়ও অতিরিক্ত নুন না দেওয়াই ভালো।
দুধ থেকে তৈরি পনির বা কটেজ চিজ প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের উৎস। এর সঙ্গে আপেল, পেয়ারা বা অন্য কোনও তাজা ফল খেলে স্ন্যাকসটি আরও পুষ্টিকর হয়।
কেন উপকারী: কম ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার হৃদযন্ত্রের জন্য উপযোগী খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে পনিরের ধরন অনুযায়ী স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও নুনের পরিমাণ অনেকটাই বদলে যায়। তাই সম্ভব হলে কম ফ্যাট ও কম নুনযুক্ত বিকল্প বেছে নেওয়া উচিত।
বাড়িতে অল্প তাপে শুকনো ভাজা ছোলা তৈরি করা যায়। সামান্য জিরে, গোলমরিচ বা অন্যান্য মশলা দিয়ে স্বাদ বাড়ানো সম্ভব। এতে অতিরিক্ত তেল বা নুনের প্রয়োজন হয় না।
কেন উপকারী: ছোলার প্রোটিন ও ফাইবার পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। প্যাকেটজাত চিপস বা অতিরিক্ত নুনযুক্ত ভাজাভুজির পরিবর্তে অল্প তেল বা তেল ছাড়া তৈরি ছোলা একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
তবে দোকানের প্যাকেটজাত ভাজা ছোলায় কতটা নুন, তেল ও অন্যান্য উপাদান রয়েছে, তা যাচাই করা দরকার।
আটার বা সম্পূর্ণ শস্যের পাউরুটির উপর অল্প পরিমাণ চিনাবাদামের মাখন লাগিয়ে খাওয়া যায়। চিনাবাদামের মাখনে প্রোটিন ও অসম্পৃক্ত ফ্যাট থাকে, আর হোল-গ্রেন পাউরুটি থেকে ফাইবার পাওয়া যায়।
কেন উপকারী: সম্পূর্ণ শস্য এবং বাদামজাত খাবারকে খাদ্যতালিকায় রাখলে প্রোটিন, ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সমন্বয় পাওয়া যায়। এটি দ্রুত তৈরি করা যায় এবং অফিসে বা বাড়িতে খাওয়ার জন্য সুবিধাজনক।
তবে চিনাবাদামের মাখন কেনার সময় এমন পণ্য বেছে নিন যাতে অতিরিক্ত চিনি, নুন বা আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল নেই। পরিমাণও নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
হৃদযন্ত্রের যত্ন নিতে স্ন্যাকসের পাশাপাশি দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
নুন কম খান: অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করতে পারে। আচার, নোনতা চিপস, চানাচুর ও অতিরিক্ত নুন দেওয়া প্যাকেটজাত খাবার কম খাওয়ার চেষ্টা করুন।
ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার বেছে নিন: ফল, সবজি, ডাল, বাদাম ও সম্পূর্ণ শস্যের খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখুন।
স্বাস্থ্যকর ফ্যাটকে গুরুত্ব দিন: বাদাম, বীজ ও উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ তেলের মতো অসম্পৃক্ত ফ্যাটের উৎস বেছে নিন। স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকা খাবার সীমিত রাখুন।
অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলুন: মিষ্টি দই, চিনিযুক্ত পানীয় এবং চিনি মাখানো স্ন্যাকসের পরিবর্তে কম চিনি বা চিনি ছাড়া বিকল্প বেছে নিন।
খাবারের পরিমাণ বুঝে খান: স্বাস্থ্যকর খাবার হলেও অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে মোট ক্যালরি বেড়ে যেতে পারে।
প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান: প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় লেবেলে প্রোটিনের পাশাপাশি নুন, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনির পরিমাণও পরীক্ষা করুন।
যাঁদের হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির সমস্যা, ডায়াবেটিস বা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, তাঁদের জন্য সব ধরনের উচ্চ-প্রোটিনযুক্ত খাবার সমান উপযোগী নাও হতে পারে। বিশেষ করে কিডনির রোগ থাকলে প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা উচিত। বাদাম, ডিম, দুধ বা সয়াবিনে অ্যালার্জি থাকলেও উপযুক্ত বিকল্প বেছে নিতে হবে।
হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে দামি সাপ্লিমেন্ট বা বিশেষ কোনও খাবারের উপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সেদ্ধ ছোলা, ভাজা ছোলা, বাদাম, সেদ্ধ ডিম, সাধারণ দই, সয়াবিন ও সম্পূর্ণ শস্যের মতো সহজলভ্য খাবার রাখা যেতে পারে। তবে কোনও একটি স্ন্যাকস খেলেই হৃদরোগের ঝুঁকি দূর হয় না। নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং সামগ্রিকভাবে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাই দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।