মাত্র ১১৪ বলে দ্বিশতক, ১১৬ বলে ২০২ রানের বিধ্বংসী ইনিংস ইংল্যান্ড অধিনায়কের। শুবমান গিলের রেকর্ড ভেঙে ইংল্যান্ডের প্রথম ব্যাটার হিসেবে ওয়ান ডে ক্রিকেটে দ্বিশতক, কিন্তু ব্রুকের রেকর্ড গড়া ইনিংসও বাঁচাতে পারল না দলকে—শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য জয়। =
ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়ে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়ে নিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে (ওডিআই) দুরন্ত ব্যাটিং করে মাত্র ১১৪ বলে দ্বিশতক পূর্ণ করলেন তিনি। ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ত্রিদেশীয় সিরিজের ম্যাচে ব্রুকের এই অসাধারণ ইনিংস নতুন বিশ্বরেকর্ড তৈরি করেছে। তিনি ভেঙে দিয়েছেন ভারতের শুবমান গিলের দ্রুততম ওডিআই দ্বিশতকের রেকর্ড। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের হয়ে প্রথম ব্যাটার হিসেবে এই ফরম্যাটে দ্বিশতক করার কৃতিত্বও অর্জন করেছেন তিনি।
তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের এমন স্মরণীয় দিনেও শেষ পর্যন্ত জয়ের হাসি হাসতে পারেনি ইংল্যান্ড। ব্রুকের ২০২ রানের ইনিংসের সুবাদে ইংল্যান্ড ৫০ ওভারে ৪ উইকেটে ৪২৯ রানের বিশাল স্কোর গড়লেও শ্রীলঙ্কা ৪৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ২ উইকেটে জয় ছিনিয়ে নেয়। ম্যাচ শেষ হয় ইনিংসের শেষ ওভারের পঞ্চম বলে ছক্কায়, হাতে তখনও দুই উইকেট। ফলে ব্রুকের রেকর্ড গড়া ইনিংস পরিণত হয় পরাজয়ের মাঝেও উজ্জ্বল এক ব্যক্তিগত কীর্তিতে।
ওডিআই ক্রিকেটে দ্রুততম দ্বিশতকের রেকর্ড এত দিন ছিল ভারতীয় ব্যাটার শুবমান গিলের দখলে। তিনি আগের মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১১৭ বলে ২০০ রান পূর্ণ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই রেকর্ডকে তিন বলের ব্যবধানে পিছনে ফেলে দিলেন ব্রুক। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে মাত্র ১১৪ বলেই ২০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক।
ব্রুকের ইনিংসের বিশেষত্ব শুধু দ্রুত দ্বিশতকেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শেষ পর্যন্ত ১১৬ বলে ২০২ রান করে আউট হন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ২১টি চার ও ১০টি ছয়। অর্থাৎ বাউন্ডারি থেকেই তিনি সংগ্রহ করেন ১৪৪ রান। এমন বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের ফলে শ্রীলঙ্কার বোলারদের উপর ক্রমশ চাপ বাড়তে থাকে এবং ইংল্যান্ডের স্কোর দ্রুত চারশোর গণ্ডি পেরিয়ে যায়।
এই ইনিংসের আগে ওডিআই ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের কোনও ব্যাটার দ্বিশতক করতে পারেননি। দেশের হয়ে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড ছিল বেন স্টোকসের। ২০২৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিনি ১৮২ রান করেছিলেন। ব্রুক শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সেই রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়ে ২০২ রানে পৌঁছন। ফলে ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন নজির তৈরি হয়।
ব্রুকের এই কীর্তি আরও উল্লেখযোগ্য, কারণ তিনি ব্যাটিং অর্ডারের চার নম্বরে নেমে এই রান করেন। ইনিংসের শুরুতে তুলনামূলক ধীর গতিতে খেললেও পরে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ম্যাচের ছবিই বদলে দেন তিনি। তাঁর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন অভিজ্ঞ ব্যাটার জো রুট এবং পরে উইল জ্যাকস। শেষের দিকে দ্রুত রান তোলার ফলে ইংল্যান্ড বড় স্কোরে পৌঁছতে সক্ষম হয়।
ব্রুকের অসাধারণ ইনিংসকে শক্ত ভিত দেয় জো রুটের সঙ্গে তাঁর জুটি। রুট ৬৬ বলে ৬৯ রান করেন। অন্যদিকে উইল জ্যাকস মাত্র ৩০ বলে অপরাজিত ৬৬ রান করে ইংল্যান্ডের স্কোরকে আরও উঁচুতে নিয়ে যান। শেষ ১০ ওভারে ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা দ্রুত রান তোলেন এবং দলকে ৪২৯ রানে পৌঁছে দেন। পাকিস্তানের মাটিতে পুরুষদের ওডিআই ক্রিকেটে এটিই সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল।
শুরুতে ইংল্যান্ডের রান তোলার গতি খুব বেশি ছিল না। কিন্তু ব্রুক ক্রিজে জমে যাওয়ার পর ম্যাচের গতি বদলে যায়। বড় শট খেলার পাশাপাশি ফাঁকা জায়গা খুঁজে রান নেওয়ার দক্ষতাও দেখান তিনি। তাঁর ব্যাটিংয়ের ফলে শেষের দিকে ইংল্যান্ডের রান দ্রুত বাড়তে থাকে এবং শ্রীলঙ্কার সামনে দাঁড়ায় ৪৩০ রানের কঠিন লক্ষ্য।
ক্রিকেটের রোমাঞ্চ অবশ্য সেখানেই শেষ হয়নি। ৪৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শ্রীলঙ্কা শুরুতে উইকেট হারালেও লড়াই থেকে সরে দাঁড়ায়নি। পাভান রত্ননায়েকে ১০৬ বলে ১৩০ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। আভিষ্কা ফার্নান্দো ও দাসুন শনাকা দু’জনেই ৯৭ রান করে দলের জয়ের ভিত মজবুত করেন। শেষ দিকে জানিথ লিয়ানাগে অপরাজিত ৬১ রান করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
শেষ ওভারে জয়ের জন্য শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন ছিল আট রান। ইংল্যান্ডের বোলার জশ টং শেষ মুহূর্তে পরপর দুটি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে উত্তেজনা ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু পঞ্চম বলে লিয়ানাগে ছক্কা হাঁকিয়ে শ্রীলঙ্কাকে জয় এনে দেন। দুই উইকেট হাতে রেখে এবং এক বল বাকি থাকতেই ৪৩০ রানের লক্ষ্য অতিক্রম করে শ্রীলঙ্কা। পুরুষদের ওডিআই ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল রান তাড়া বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ম্যাচে তৈরি হয় একাধিক উল্লেখযোগ্য নজির। একদিকে ব্রুকের দ্রুততম দ্বিশতক, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ৪২৯ রান এবং শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য রান তাড়া—সব মিলিয়ে ম্যাচটি ওডিআই ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত লড়াই হয়ে উঠেছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, দ্বিশতক করা সত্ত্বেও ম্যাচে পরাজিত দলের অধিনায়ক হিসেবেই মাঠ ছাড়তে হয় ব্রুককে।
ক্রিকেটে ব্যক্তিগত সাফল্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই শেষ পর্যন্ত দলের জয়ই বড় লক্ষ্য। ব্রুকের ২০২ রানের ইনিংস ইংল্যান্ডকে বিশাল স্কোর এনে দিলেও বোলিংয়ের সময় সেই রান রক্ষা করতে পারেনি দল। শ্রীলঙ্কার ব্যাটাররা ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ চালিয়ে ইংল্যান্ডের বোলারদের উপর চাপ বজায় রাখেন। ফলে রেকর্ড গড়া ইনিংসের আনন্দ শেষ পর্যন্ত ম্লান হয়ে যায় পরাজয়ের কারণে।
তবে এই ম্যাচে ব্রুক যে ব্যাটিং দক্ষতা ও আক্রমণাত্মক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা তাঁর ক্রিকেটজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। দ্রুততম দ্বিশতকের রেকর্ড এবং ইংল্যান্ডের হয়ে প্রথম ওডিআই দ্বিশতক—দুটি কীর্তিই তাঁকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে হ্যারি ব্রুকের ২০২ রানের ইনিংস ওডিআই ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস তৈরি করল। মাত্র ১১৪ বলে দ্বিশতক করে শুবমান গিলের রেকর্ড ভাঙলেন তিনি, কিন্তু দলকে জেতাতে পারলেন না। রেকর্ডের উজ্জ্বলতা আর শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য জয়—দুইয়ের মেলবন্ধনে রাওয়ালপিন্ডির এই ম্যাচ দীর্ঘদিন ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে থাকবে।