নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ঢাকের মৃদু শব্দ, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর লাল সিঁদুরের রঙে মেতে উঠেছে বিজয়া দশমী। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে একদিকে যেমন বিষাদের সুর, অন্যদিকে তেমনই সিঁদুর খেলা ও দেবীবরণের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দে মেতে উঠেছেন মহিলারা। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বিভিন্ন বনেদি বাড়িতে মহা দশমীর এই ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হচ্ছে। উৎসবের শেষ দিনে মনোরম আবহাওয়াও মানুষের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দুর্গাপুজোর চার দিনের আনন্দ পেরিয়ে এসেছে বিদায়ের পালা। বিজয়া দশমী মানেই মায়ের কাছে আগামী বছর আবার ফিরে আসার প্রার্থনা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আবেগঘন মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া এবং প্রিয়জনদের বিজয়ার শুভেচ্ছা জানানো। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন প্রাচীন বনেদি বাড়িতে সেই চেনা ঐতিহ্য ও আবেগের ছবি দেখা যাচ্ছে। বারুইপুর, জয়নগর, মথুরাপুর ও ডায়মন্ড হারবার-সহ জেলার বিভিন্ন এলাকার বনেদি বাড়িগুলিতে দশমীর প্রথা মেনে চলছে দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলার আয়োজন।
বিজয়া দশমীর সকালে পুজোর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর শুরু হয় দেবী বরণের পর্ব। প্রথা মেনে দেবী দুর্গাকে সিঁদুর, মিষ্টি এবং অন্যান্য উপাচার নিবেদন করে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নেন মহিলারা। শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে বনেদি বাড়ির পুজো প্রাঙ্গণ।
বহু প্রাচীন বনেদি বাড়িতে দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, পরিবারের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি আবেগের বিষয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রীতিনীতি আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় দশমীর সকালে দেবীবরণ ঘিরে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি উপস্থিত হন আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনেরাও।
দশমীর অন্যতম আকর্ষণ সিঁদুর খেলা। দেবী দুর্গার কপালে ও পায়ে সিঁদুর নিবেদনের পর মহিলারা একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান। হাসি, আনন্দ, মিষ্টিমুখ এবং ছবি তোলার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় উৎসবের এক আবেগঘন পরিবেশ।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বনেদি বাড়িগুলিতে এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। লাল পাড় সাদা শাড়ি কিংবা উৎসবের বিশেষ পোশাকে সেজে মহিলারা অংশ নেন সিঁদুর খেলায়। প্রিয়জনদের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি চলে আগামী বছরের পুজোয় আবার একসঙ্গে মিলিত হওয়ার প্রত্যাশা।
তবে সিঁদুর খেলা শুধু একটি আচার নয়, এটি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পুজোর আয়োজনের ধরন বদলালেও এই প্রথার আবেগ আজও অটুট রয়েছে। বিশেষ করে বনেদি বাড়ির পুজোগুলিতে সেই ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
দশমীর দিনে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎসবের আয়োজনেও মিলেছে স্বস্তি। রোদ ও হালকা বাতাসের মধ্যে দেবীবরণ, সিঁদুর খেলা এবং প্রতিমা দর্শনে অংশ নিচ্ছেন মানুষজন। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে বিসর্জনের প্রস্তুতি এবং ঘাটমুখী যাতায়াতও তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
পুজোর শেষ দিনে অনেকেই পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বনেদি বাড়ির পুজো দেখতে বেরিয়ে পড়েন। তাই আবহাওয়া ভালো থাকলে উৎসবের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তবে দিনের তাপমাত্রা বা বৃষ্টির সম্ভাবনা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া আবহাওয়ার বিস্তারিত পূর্বাভাস নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সিঁদুর খেলা ও দেবীবরণের পর্ব শেষ হলেই শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি। স্থানীয় নদী, পুকুর কিংবা নির্দিষ্ট বিসর্জনঘাটে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করেন পুজো উদ্যোক্তারা। দেবীকে বিদায় জানানোর সময় অনেকের চোখে জল আসে। ঢাকের শব্দের সঙ্গে মিশে যায় আবেগ আর আগামী বছর আবার মায়ের আগমনের অপেক্ষা।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় দশমীর এই শেষ পর্ব ঘিরে রয়েছে বিশেষ উৎসাহ। তবে বিসর্জনের সময় নিরাপত্তা বজায় রাখা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং জলাশয়ের কাছে সতর্কতা অবলম্বন করাও অত্যন্ত জরুরি। উৎসবের আনন্দ যেন কোনওভাবেই দুর্ঘটনার কারণ না হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে পুজো উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বনেদি বাড়িগুলিতে বিজয়া দশমী মানেই প্রাচীন ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি, পারিবারিক মিলন এবং আবেগঘন বিদায়ের মুহূর্ত। সিঁদুর খেলার লাল রং, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি এবং দেবী বরণের মধ্য দিয়ে আরও একটি দুর্গোৎসবের সমাপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে জেলা।
উৎসবের আনন্দের মাঝেই রয়েছে বিচ্ছেদের বেদনা। আজ মা দুর্গাকে বিদায় জানালেও বাঙালির মনে থেকে যায় সেই চিরন্তন আশ্বাস—আবার এক বছর পর ফিরে আসবেন উমা। তাই বিজয়া দশমী শুধু বিদায়ের দিন নয়, আগামী দিনের আনন্দ ও পুনর্মিলনের প্রত্যাশারও দিন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বনেদি বাড়িগুলিতে ঐতিহ্য, সিঁদুরের রং এবং উৎসবের আবেগে পালিত হচ্ছে বিজয়া দশমী। এবার অপেক্ষা দেবীর নিরঞ্জন, আর তার পরেই শুরু হবে আগামী বছরের দুর্গাপুজোর দিন গোনার পালা।