Home ফ্যাক্ট ফাইল পঞ্চায়েতের পাঁচ কাহন পৌর বার্তা জেলার চালচিত্র চাষী ভাই বলছি শরীর স্বাস্থ্য জেলার সেনাপতি মাঠে ময়দানে বিনোদন সম্পাদকীয় কলম
BREAKING NEWS
বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের বড় সাফল্য! ২০২৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে আমেরিকাকে পিছনে ফেলার দাবি   •   পশ্চিমবঙ্গে করমুক্ত নীতেশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’! দশেরার মঞ্চে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর, উপস্থিত রণবীর কাপুর ও যশ   •   দক্ষিণ ২৪ পরগনার বনেদি বাড়িতে নির্বিঘ্নে সিঁদুর খেলা, মনোরম আবহাওয়ায় উৎসবমুখর বিজয়া দশমী   •   ঢাকের শব্দে বিদায়ের সুর, বুড়িগঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে কড়া নিরাপত্তা পুরান ঢাকায়   •   সপরিবারে রংমিলান্তি পোশাকে নবমীর সন্ধ্যা জমজমাট রাজ-শুভশ্রীর, নজর কাড়ল তারকা পরিবারের সাজ   •   চোরবাগান পদপিষ্ট-কাণ্ডে নতুন বিতর্ক, চিকিৎসকদের ডিউটি নিয়ে স্বাস্থ্য দফতরের কাছে রিপোর্ট তলব মুখ্যমন্ত্রীর

বিজয়া দশমীর বিসর্জন: চোরাবাগানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ

21 Oct 2026
10:59 AM


সম্পাদকের কলমে: বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর সমাপ্তি। চার দিনের আনন্দ, উৎসাহ, মিলন এবং উৎসবের আবহ পেরিয়ে এসেছে বিজয়া দশমী। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আরও একটি বছরের জন্য বিদায় নিচ্ছেন দেবী দুর্গা। কিন্তু উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি এ বছর দুর্গাপুজোর সময় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা এবং চোরাবাগান-কাণ্ডের মতো ঘটনাগুলি নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে সমাজ ও প্রশাসনকে। প্রশ্ন উঠছে, উৎসবের আয়োজন যত বড় হচ্ছে, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি কি সেই অনুপাতে বাড়ছে? নাকি কোনও দুর্ঘটনা ঘটার পরেই দায় নির্ধারণের প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে?

দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। পুজো মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, শোভাযাত্রা এবং বিসর্জন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই থাকে বিপুল জনসমাগম। ফলে নিরাপত্তার প্রশ্নটি কোনওভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। বিশেষ করে বিসর্জনের দিন নদী, পুকুর কিংবা অন্যান্য জলাশয়ের ঘাটে মানুষের ভিড় বাড়ে। সেখানে সামান্য অসতর্কতা কিংবা ব্যবস্থাপনার ত্রুটি বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এ বছরের দুর্ঘটনাগুলি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। চোরাবাগান-কাণ্ডকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজা, বিরোধীদের আক্রমণ এবং শাসকপক্ষের উপর দায় চাপানোর প্রবণতা জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে কোনও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দোষারোপই শেষ কথা হতে পারে না। ঘটনার প্রকৃত কারণ কী, কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল, সংশ্লিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই সামনে আসা উচিত।

একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি, দুর্ঘটনার জন্য অসচেতনতা দায়ী হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ঘটনার দায় কেবল সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। কোথাও আয়োজকদের ভূমিকা, কোথাও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, আবার কোথাও প্রশাসনিক নজরদারির অভাব থাকতে পারে। তাই আবেগ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুস্থ পথ। প্রশাসনের কাজ শুধু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা নয়, ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ঘটনা না ঘটে, তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও।

এই প্রেক্ষাপটে বিজয়া দশমীর বিসর্জনকে কেন্দ্র করে রাজ্য ও জেলা প্রশাসনের তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন নিরঞ্জন ঘাটে নিরাপত্তা জোরদার করা, পুলিশি নজরদারি বৃদ্ধি, স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে লাগানো এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় রাখার মতো পদক্ষেপ জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে। নদীমাতৃক বিসর্জন ঘাটগুলিতে স্পিডবোট ও ছোট নৌকা প্রস্তুত রাখা, বিপজ্জনক এলাকায় নজরদারি চালানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজের ব্যবস্থা থাকা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়।

তবে শুধু স্পিডবোট বা উদ্ধারকারী নৌকা রাখলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, লাইফ জ্যাকেট, ঘাটে আলোর ব্যবস্থা, ভিড় নিয়ন্ত্রণের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় প্রতিমা নামানো হবে, কোন পথে শোভাযাত্রা এগোবে এবং বিসর্জনের পর মানুষ কীভাবে নিরাপদে বেরিয়ে আসবেন—এই প্রতিটি বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, পুরসভা বা পঞ্চায়েত এবং পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় যত মজবুত হবে, দুর্ঘটনার আশঙ্কা ততটাই কমানো সম্ভব।

বিসর্জনের সময় ডিজে বাজানো নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তও নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ শব্দ, অতিরিক্ত উন্মাদনা এবং শোভাযাত্রার পথে বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; তার যথাযথ বাস্তবায়ন এবং সব পক্ষকে নিয়ম সম্পর্কে সচেতন করাও জরুরি। উৎসবের আনন্দ বজায় রেখেই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

এখানে স্থানীয় নেতৃত্ব এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির ভূমিকাও উপেক্ষা করা যায় না। তাঁরা মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, পথনির্দেশ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবকদেরও উপযুক্ত নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। তাঁদের উপর অতিরিক্ত দায় চাপিয়ে দিয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া কোনওভাবেই কাম্য নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নিরাপত্তা যেন কেবল বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তৎপর হওয়ার পরিবর্তে উৎসব শুরুর আগে ঝুঁকি চিহ্নিত করা, দুর্বল পরিকাঠামো মেরামত করা এবং আগাম পরিকল্পনা তৈরি করাই হওয়া উচিত প্রশাসনের অগ্রাধিকার। চোরাবাগানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ শুধু নিরাপত্তা বাড়ানো নয়, বরং কোথায় ভুল হয়েছিল তা চিহ্নিত করে ভবিষ্যতের জন্য স্থায়ী সমাধান তৈরি করা।

দুর্গাপুজোর বিসর্জন আনন্দের সমাপ্তি, কিন্তু দায়িত্বের সমাপ্তি নয়। শাসক, বিরোধী, প্রশাসন, পুজো উদ্যোক্তা এবং সাধারণ নাগরিক—সকলেরই ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্ক গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠা জরুরি। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন আগাম সতর্কতা ও জবাবদিহি।

বিজয়া দশমীর প্রকৃত বার্তা হোক অশুভের বিনাশ এবং শুভবোধের প্রতিষ্ঠা। প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে যেন বিসর্জন ঘটে অসতর্কতা, অব্যবস্থা এবং দায় এড়ানোর প্রবণতারও। রাজ্য ও জেলা প্রশাসনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি কতটা কার্যকর হবে, তার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে মানুষের নিরাপদে বাড়ি ফেরার মধ্য দিয়ে। কারণ উৎসবের সার্থকতা শুধু আনন্দে নয়, সেই আনন্দের শেষে প্রতিটি মানুষের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনেও।