নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে বিপুল সংখ্যক উপভোক্তার তথ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং সরকারি অর্থের সম্ভাব্য অপচয়ের অভিযোগ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ১০০ দিনের কাজ থেকে স্বাস্থ্যসাথী—বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, কাটমানি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। তাঁর বক্তব্যের মূল প্রশ্ন, সাধারণ মানুষের করের টাকা কোথায় গেল এবং প্রকল্পের নামে যে বিপুল অর্থ খরচ হয়েছে, তার প্রকৃত হিসাব কে দেবে?
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকা যাচাই করতে গিয়ে ৩০ লক্ষেরও বেশি মানুষের হদিশ না পাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সরকারি সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, সন্দেহজনক উপভোক্তাদের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিমাণ নিয়ে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত প্রশ্ন উঠেছে। তবে এই অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়েছে—এমন চূড়ান্ত প্রমাণ এখনও প্রকাশিত হয়নি। উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই এবং আর্থিক নিরীক্ষার ফলের ওপরই প্রকৃত চিত্র নির্ভর করবে।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক নাম ও ঠিকানার অসঙ্গতি সামনে এসেছে বলে দাবি করেছে রাজ্য সরকার। নতুন স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের আওতায় উপভোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। সেই সময় বহু কার্ডধারীর বর্তমান ঠিকানা বা পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে প্রশাসনিক সূত্রের বক্তব্য।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, এতদিন ধরে সংশ্লিষ্ট উপভোক্তাদের নামে কীভাবে সরকারি প্রকল্পের হিসাব পরিচালিত হয়েছে? তাঁদের নামে কোনও বিমার প্রিমিয়াম দেওয়া হয়ে থাকলে সেই অর্থের হিসাব কী? কোথাও ভুয়ো নথি, জাল চিকিৎসার কাগজপত্র কিংবা অসাধু চক্রের ভূমিকা রয়েছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের করের টাকা এবং সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে। তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে—যে অর্থ মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য বরাদ্দ, তা প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছেছে কি না।
১০০ দিনের কাজের প্রকল্প গ্রামীণ এলাকার বহু শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। এই প্রকল্পে কাজের হিসাব, জব কার্ড, শ্রমিকের উপস্থিতি, মজুরি প্রদান এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন—প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। কোথাও ভুয়ো নাম, অনিয়মিত উপস্থিতি বা মজুরি নিয়ে কারচুপির অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
একইভাবে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের ক্ষেত্রেও উপভোক্তা তালিকা, হাসপাতালের বিল, চিকিৎসার নথি এবং বিমার অর্থ প্রদানের হিসাব খতিয়ে দেখা দরকার। কোনও হাসপাতাল, সংস্থা বা মধ্যস্থতাকারী বেআইনিভাবে সরকারি অর্থ নিয়ে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অধীরের রাজনৈতিক বক্তব্যে এই দুই প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে বৃহত্তর দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আনা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, সরকারি প্রকল্পের নাম করে সাধারণ মানুষের অর্থের অপব্যবহার হলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের পাশাপাশি রাজ্যের একাধিক সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের উপভোক্তা তালিকা যাচাইয়ের খবর সামনে এসেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল সংখ্যক উপভোক্তার তথ্য যাচাই করা যাচ্ছে না এবং এর ফলে সরকারি কোষাগারের সম্ভাব্য সাশ্রয় বা অপচয়ের অঙ্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কিছু প্রতিবেদনে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত সম্ভাব্য ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। তবে এই অঙ্ককে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে প্রমাণিত দুর্নীতির পরিমাণ হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না। এটি বিভিন্ন প্রকল্পের সন্দেহজনক বা অযাচাইকৃত উপভোক্তার সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে প্রশাসনিক সূত্রের অনুমান। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং ফরেনসিক অডিটের কথা উঠে এসেছে।
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যে আরও একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। তাঁর কটাক্ষ, রাজনৈতিক দল বা রং পরিবর্তন করলেই কোনও ব্যক্তির অতীতের অভিযোগ কিংবা কাজের দায় মুছে যায় না। তাঁর বক্তব্যের ভাবার্থ, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কেউ রাজনৈতিক শিবির পরিবর্তন করলেই তাঁকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দোষ বা সাধু বলে ধরে নেওয়া যায় না।
এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক দলবদল এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হলে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তদন্ত, নথি এবং আদালতের সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি।
রাজনীতিতে দলবদল নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু সরকারি প্রকল্পের অর্থের অপব্যবহার বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই নিয়ম সব রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
সরকারি প্রকল্পের অর্থ আসে মূলত জনগণের কর এবং অন্যান্য সরকারি রাজস্ব থেকে। সেই অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মানে সাধারণ মানুষের অধিকার ও স্বার্থের প্রশ্ন ওঠা। স্বাস্থ্যসাথীর মতো স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ পরিবারকে চিকিৎসার আর্থিক চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। অন্যদিকে ১০০ দিনের কাজের মতো প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
তাই এই প্রকল্পগুলিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে যাচাইয়ের সময় কোনও প্রকৃত উপভোক্তা যেন ভুলবশত তালিকা থেকে বাদ না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। ঠিকানা পরিবর্তন, পরিযায়ী শ্রমিকের বাইরে থাকা কিংবা নথিগত ত্রুটির কারণে কাউকে খুঁজে না পাওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়ো উপভোক্তা তৈরি করা—এই দুই পরিস্থিতি এক নয়।
সরকারের উচিত প্রতিটি অভিযোগ আলাদা করে যাচাই করা এবং প্রকৃত অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে, কত টাকা কোথায় খরচ হয়েছে এবং কত টাকা উদ্ধার বা সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের সন্দেহজনক কার্ড ও উপভোক্তাদের তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি ফরেনসিক অডিটের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে রাজ্য সরকার। এই নিরীক্ষায় প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন, চিকিৎসার নথি, হাসপাতালের দাবি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির ভূমিকা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্যে এলে বোঝা যাবে, অভিযোগের কতটা সত্যতা রয়েছে এবং আর্থিক অনিয়মের প্রকৃত পরিমাণ কত। শুধু রাজনৈতিক অভিযোগ বা প্রশাসনিক অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। একইভাবে প্রকৃত অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়াও উচিত নয়।
স্বাস্থ্যসাথী ও ১০০ দিনের কাজের মতো প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সাধারণ মানুষের কাছে রাজনৈতিক তরজার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল প্রকৃত পরিষেবা পাওয়া। যাঁদের স্বাস্থ্যবিমার প্রয়োজন, তাঁরা যেন চিকিৎসার সুবিধা পান। যাঁরা কাজের উপর নির্ভর করে সংসার চালান, তাঁদের মজুরি যেন সময়মতো পৌঁছয়।
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যে সরকারি প্রকল্পের অর্থের হিসাব এবং রাজনৈতিক দলবদলের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। এখন প্রয়োজন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকল্পভিত্তিক নির্ভুল হিসাব এবং জনগণের সামনে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ। কারণ সরকারি কোষাগারের প্রতিটি টাকার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের অধিকার।
শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে একটি প্রশ্নেরই উত্তর প্রয়োজন—সরকারি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থ কতটা প্রকৃত উপভোক্তাদের কাজে লেগেছে এবং কোথাও দুর্নীতি হয়ে থাকলে তার দায় কার? সেই উত্তর মিলতে পারে কেবল স্বচ্ছ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য নিরীক্ষা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই।