নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশার একটি অত্যন্ত পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেমন এই সমস্যা দেখা যায়, তেমনই কম বয়সিদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা বাড়ছে। অনিয়মিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, শরীরচর্চার অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এই সমস্যার অন্যতম কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনির সমস্যা-সহ একাধিক গুরুতর শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র ওষুধের উপর নির্ভর করলেই হবে না। পাশাপাশি জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনাও অত্যন্ত জরুরি। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম। প্রতিদিন নিজের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যায়াম করলে স্বাভাবিকভাবেই রক্তচাপ কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য পাওয়া যায়।
নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। শারীরিক পরিশ্রমের ফলে হৃদ্যন্ত্র ধীরে ধীরে আরও দক্ষ হয়ে ওঠে। ফলে রক্ত সঞ্চালনের জন্য হৃদ্যন্ত্রকে তুলনামূলকভাবে কম পরিশ্রম করতে হতে পারে।
পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানো, ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করা এবং মানসিক চাপ কমানোর ক্ষেত্রেও ব্যায়ামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক—উভয় ধরনের রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য খুব কঠিন বা ব্যয়বহুল ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটার অভ্যাসই হতে পারে একটি কার্যকর উপায়।
সকালে অথবা বিকেলে নিজের সুবিধামতো সময়ে ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস তৈরি করতে পারেন। যাঁদের দীর্ঘক্ষণ হাঁটার অভ্যাস নেই, তাঁরা প্রথমে ১০ থেকে ১৫ মিনিট দিয়ে শুরু করতে পারেন। এরপর ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো যেতে পারে।
হাঁটার সময় এমন গতি বজায় রাখা ভালো, যাতে শরীরের উপর মাঝারি মাত্রার পরিশ্রম হয়, কিন্তু কথা বলতে অতিরিক্ত অসুবিধা না হয়।
সাইকেল চালানো একটি ভালো অ্যারোবিক ব্যায়াম। নিয়মিত সাইকেল চালালে হৃদ্যন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়তে পারে এবং শরীরের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নতি হতে পারে।
যাঁরা হাঁটার পাশাপাশি অন্য কোনও ব্যায়াম করতে চান, তাঁরা শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী সাইকেল চালানোর অভ্যাস করতে পারেন। তবে বয়স্ক ব্যক্তি বা যাঁদের ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে স্থির সাইকেল তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে যোগব্যায়ামও সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন, ধ্যান এবং শিথিলায়নের বিভিন্ন পদ্ধতি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত যোগব্যায়াম করলে মন শান্ত রাখা, ঘুমের উন্নতি এবং সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখা সহজ হয়।
তবে যোগব্যায়াম করার সময় নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রাখা জরুরি। অতিরিক্ত কঠিন আসন, দীর্ঘক্ষণ শ্বাস আটকে রাখা অথবা জোর করে শ্বাস নেওয়া এড়িয়ে চলা উচিত।
শুধু হাঁটা বা সাইকেল চালানো নয়, সপ্তাহে অন্তত দুদিন হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়ামও করা যেতে পারে। যেমন হালকা ওজন তোলা, নিজের শরীরের ওজন ব্যবহার করে সহজ ব্যায়াম এবং প্রশিক্ষকের পরামর্শ অনুযায়ী পেশির শক্তি বাড়ানোর অনুশীলন।
এই ধরনের ব্যায়াম পেশির কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে এবং শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করে।
তবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে অতিরিক্ত ভারী ওজন তোলা, হঠাৎ অত্যধিক চাপ দেওয়া এবং ব্যায়ামের সময় শ্বাস আটকে রাখা উচিত নয়। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থাকলে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণ স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়াম করার লক্ষ্য রাখা যেতে পারে।
অর্থাৎ সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে দ্রুত হাঁটলেই এই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুদিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করা যেতে পারে।
তবে যাঁরা দীর্ঘদিন ব্যায়াম করেননি, তাঁদের একদিনেই বেশি সময় শরীরচর্চা শুরু করা উচিত নয়। ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করাই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যায়ামের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের দিকেও নজর দিতে হবে।
১. লবণ কম খান: অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তাই খাবারে বাড়তি লবণ দেওয়া এবং অতিরিক্ত নোনতা খাবার খাওয়া কমাতে হবে।
২. শাকসবজি ও ফল খান: প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল এবং আঁশযুক্ত খাবার রাখুন।
৩. অতিরিক্ত তেল-চর্বি এড়িয়ে চলুন: ভাজাভুজি, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং বেশি চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়া ভালো।
৪. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে পারলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হতে পারে।
৫. পর্যাপ্ত ঘুমান: প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি করুন।
উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ব্যায়াম শুরু করার আগে নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যায়ামের আগে কয়েক মিনিট ওয়ার্ম-আপ করুন।
প্রথম দিন থেকেই অতিরিক্ত পরিশ্রম করবেন না।
ধীরে ধীরে ব্যায়ামের সময় ও গতি বাড়ান।
প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন।
ব্যায়ামের সময় স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন।
মাথা ঘোরা, বুকে ব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট বা দুর্বলতা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যায়াম বন্ধ করুন এবং চিকিৎসার পরামর্শ নিন।
যাঁদের রক্তচাপ খুব বেশি বা নিয়ন্ত্রণে নেই, কিংবা হৃদ্রোগ ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া কঠিন ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মনে রাখতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করলেও এটি উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের বিকল্প নয়।
অনেক ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধও চালিয়ে যেতে হয়। ব্যায়াম করার পর রক্তচাপ কমে এলেও নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করা বা ডোজ পরিবর্তন করা বিপজ্জনক হতে পারে।
নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
উচ্চ রক্তচাপকে অবহেলা করার কোনও সুযোগ নেই। তবে সঠিক জীবনযাপন, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।
প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস দিয়ে শুরু হতে পারে সুস্থ জীবনের নতুন পথচলা। মনে রাখতে হবে, ব্যায়ামের উপকারিতা পেতে হলে নিয়মিত অভ্যাস বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি। নিজের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যায়াম করুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।