নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব চাষাবাদকে আরও জনপ্রিয় করে তুলতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে জৈবিক বালাই দমন পদ্ধতি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ফসলের ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে উপকারী পোকামাকড়ের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। কৃষকের জমিতে যে সমস্ত পোকা ফসলের ক্ষতি করে, তাদের দমন করতে প্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে একাধিক কার্যকর সমাধান। সেই সমাধানকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এমন এক কৃষিব্যবস্থা, যেখানে ক্ষতিকর পোকা দমনে ব্যবহার করা হবে তাদের প্রাকৃতিক শত্রুদেরই।
কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, প্রকৃতিতে সব পোকা ফসলের শত্রু নয়। কিছু পোকা ক্ষতিকর পোকাদের খেয়ে ফসলকে রক্ষা করে, আবার কিছু পরজীবী পোকা ক্ষতিকর পোকার শরীরে বা ডিমের মধ্যে বেড়ে উঠে তাদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। এই ধরনের উপকারী পোকাকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করে গবেষণাগারে উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং কৃষকের জমিতে প্রয়োগের উপযোগী করে তোলাই জৈবিক বালাই দমন গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।
ধান, গম, শাকসবজি, ডাল, ফল এবং অন্যান্য কৃষিজ ফসলের উপর বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ দেখা যায়। কখনও পাতার রস শুষে নেওয়া, কখনও কাণ্ড বা ফল ছিদ্র করা, আবার কখনও পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ফেলার মাধ্যমে এই পোকাগুলি উৎপাদনের ক্ষতি করে। কৃষকেরা অনেক সময় এই সমস্যা মোকাবিলায় রাসায়নিক কীটনাশকের উপর নির্ভর করেন।
কিন্তু সব ক্ষেত্রে নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ করলে ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি উপকারী পোকাও মারা যেতে পারে। এর ফলে প্রকৃতিতে থাকা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিছু ক্ষেত্রে কীটনাশকের প্রতি পোকাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাও তৈরি হতে পারে, ফলে একই ওষুধ বারবার ব্যবহার করেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে উপকারী পোকামাকড়ের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। লেডিবার্ড বিটল বা গুবরে পোকা, গ্রিন লেসউইং এবং বিভিন্ন প্রজাতির পরজীবী বোলতা কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোন উপকারী পোকা কোন ফসলের কোন ক্ষতিকর পোকার বিরুদ্ধে কার্যকর, তা নির্ভর করে পোকাদের প্রজাতি, ফসলের ধরন এবং স্থানীয় পরিবেশের উপর।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট গবেষণাকেন্দ্রগুলিতে জৈবিক বালাই দমন নিয়ে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উপকারী পোকাদের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বংশবিস্তার করানো। গবেষণাগারে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, খাদ্য এবং উপযুক্ত পরিচর্যার মাধ্যমে কিছু প্রজাতির উপকারী পোকা সংখ্যায় বাড়ানো যায়। পরে তাদের কার্যকারিতা যাচাই করে কৃষিজমিতে ব্যবহারের উপযোগিতা মূল্যায়ন করা হয়।
এই পদ্ধতিতে প্রথমে ক্ষতিকর পোকার প্রজাতি শনাক্ত করা হয়। এরপর সেই পোকার প্রাকৃতিক শত্রু হিসেবে পরিচিত উপকারী পোকা বা জীবকে নির্বাচন করা হয়। পরীক্ষাগারে পর্যবেক্ষণ করা হয়, নির্বাচিত জীবটি কতটা কার্যকরভাবে ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা কমাতে পারে এবং ফসলের জন্য তার ব্যবহার কতটা নিরাপদ।
গবেষণার পরবর্তী পর্যায়ে ছোট জমিতে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মাধ্যমে ফলাফল যাচাই করা হয়। উপকারী পোকার সংখ্যা, ফসলের ক্ষতির মাত্রা, উৎপাদনের পরিবর্তন এবং পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উপযুক্ত ফল পাওয়া গেলে কৃষকের কাছে এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
তবে গবেষণাগারে পোকা উৎপাদন করা এবং বাস্তব কৃষিজমিতে সফলভাবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। জমির আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, কীটনাশকের উপস্থিতি এবং ক্ষতিকর পোকার ঘনত্বের কারণে উপকারী পোকার কার্যকারিতা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই স্থানীয় পরিবেশে পরীক্ষার মাধ্যমে উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণ করা জরুরি।
ফসলের বন্ধু পোকাদের মধ্যে লেডিবার্ড বিটল বা লেডিবাগ বিশেষভাবে পরিচিত। এই গুবরে পোকার অনেক প্রজাতি এফিড বা জাবপোকা খেয়ে বেঁচে থাকে। এফিড বিভিন্ন শাকসবজি, ফুল, ফলের গাছ এবং অন্যান্য ফসলের কোমল অংশ থেকে রস শুষে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে।
লেডিবার্ড বিটলের পূর্ণাঙ্গ পোকা এবং অনেক প্রজাতির লার্ভা—উভয়ই এফিড খেয়ে তাদের সংখ্যা কমাতে সাহায্য করে। ফলে জমিতে এদের উপস্থিতি কৃষকের জন্য উপকারী হতে পারে।
কিন্তু সব লেডিবার্ড বিটল একই ধরনের খাদ্য গ্রহণ করে না। তাই কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের আগে প্রজাতি শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপকারী পোকাকে রক্ষা করার জন্য অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক প্রয়োগ কমানো এবং জমিতে তাদের বেঁচে থাকার উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখা দরকার।
কৃষিক্ষেত্রে জৈবিক বালাই দমনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ট্রাইকোগ্রামা গণের ক্ষুদ্র পরজীবী বোলতা। এরা কিছু ক্ষতিকর মথ ও প্রজাপতির ডিমের মধ্যে ডিম পাড়ে। এর ফলে ওই ক্ষতিকর পোকার স্বাভাবিক বংশবিস্তার ব্যাহত হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে শূককীটের সংখ্যা কমতে পারে।
ধান ও অন্যান্য ফসলে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষতিকর পোকার বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রজাতির ট্রাইকোগ্রামা ব্যবহার নিয়ে বহু অঞ্চলে জৈবিক বালাই দমন কর্মসূচি পরিচালিত হয়। গবেষণাগারে এই ক্ষুদ্র পরজীবী পোকা উৎপাদন করে নির্দিষ্ট সময়ে জমিতে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে।
তবে ট্রাইকোগ্রামার প্রজাতি নির্বাচন, প্রয়োগের সময়, ব্যবহারের পরিমাণ এবং পুনরায় প্রয়োগের ব্যবধান সংশ্লিষ্ট ফসল ও ক্ষতিকর পোকার উপর নির্ভর করে। তাই কৃষি বিশেষজ্ঞের নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করা উচিত।
গ্রিন লেসউইং নামের সবুজাভ ডানাবিশিষ্ট পোকাটিও কৃষিক্ষেত্রে উপকারী হিসেবে পরিচিত। এর অনেক প্রজাতির লার্ভা এফিড, থ্রিপস, সাদা মাছির অপরিণত দশা এবং অন্যান্য ছোট নরম দেহবিশিষ্ট পোকা খেতে পারে। ফলে বিভিন্ন সবজি ও উদ্যান ফসলে এদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ ছাড়াও কিছু পরজীবী বোলতা, শিকারি মাইট এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক শত্রু নির্দিষ্ট ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে প্রতিটি উপকারী জীবের কার্যকারিতা আলাদা। যে পোকা একটি ফসলে উপকারী, অন্য পরিবেশে তার ভূমিকা একই রকম নাও হতে পারে। সেই কারণে গবেষণাভিত্তিক নির্বাচন এবং পর্যবেক্ষণ ছাড়া যেকোনো উপকারী পোকা জমিতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক কীটনাশকের প্রয়োজন পুরোপুরি শেষ করে দেওয়া সব সময় সম্ভব নয়। তবে উপকারী পোকামাকড়কে কাজে লাগিয়ে অনেক ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার কমানো সম্ভব হতে পারে। এই পদ্ধতির প্রধান লক্ষ্য হলো ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা এমন পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যাতে ফসলের অর্থনৈতিক ক্ষতি কম হয়।
জৈবিক বালাই দমন পদ্ধতি এককভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, আবার অন্যান্য নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সঙ্গে সমন্বয় করেও ব্যবহার করা যায়। এই সমন্বিত ব্যবস্থাকে বলা হয় সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম (Integrated Pest Management)।
আইপিএম পদ্ধতিতে নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ, ক্ষতিকর পোকার সঠিক পরিচয় নির্ধারণ, ফসল পর্যায়ক্রমে চাষ, রোগমুক্ত চারা ব্যবহার, ফেরোমোন ফাঁদ, প্রয়োজন অনুযায়ী জৈবিক নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অনুমোদিত কীটনাশকের যুক্তিসংগত ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত থাকে।
এর ফলে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক প্রয়োগ কমানো, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশের উপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
উপকারী পোকা ব্যবহারের একটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, ক্ষতিকর পোকার প্রাকৃতিক শত্রুদের কাজে লাগিয়ে জমিতে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে পরিস্থিতি অনুযায়ী রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ও সংশ্লিষ্ট খরচ কমতে পারে। তবে এই সুবিধা সব ফসল ও সব পরিস্থিতিতে সমান নয়।
উপকারী পোকা কার্যকর হতে হলে তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ থাকা দরকার। নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ করলে এসব পোকাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার জমিতে ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে গেলে শুধু প্রাকৃতিক শত্রুর উপর নির্ভর করে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ পাওয়া নাও যেতে পারে।
তাই কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, উপকারী ও ক্ষতিকর পোকা চেনার ব্যবস্থা করা এবং সহজ ভাষায় ব্যবহারবিধি পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী ও গবেষকদের সহায়তায় কৃষকেরা জমির পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং ঋতুচক্রের পরিবর্তনের ফলে অনেক এলাকায় ফসলের ক্ষতিকর পোকার উপস্থিতি ও আক্রমণের সময় বদলে যেতে পারে। কিছু পোকার বংশবিস্তার অনুকূল পরিবেশে দ্রুত বাড়তে পারে, আবার প্রাকৃতিক শত্রুদের জীবনচক্রও আবহাওয়ার পরিবর্তনে প্রভাবিত হতে পারে।
এই কারণে স্থানীয় জলবায়ুর সঙ্গে মানানসই জৈবিক বালাই দমন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। কোন তাপমাত্রায় উপকারী পোকা বেশি সক্রিয় থাকে, কখন তাদের জমিতে ছাড়া সবচেয়ে কার্যকর এবং কোন ফসলের জন্য কোন প্রজাতি উপযোগী—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাঠপর্যায়ের গবেষণা প্রয়োজন।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, কৃষকের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় কৃষি দপ্তরের সহযোগিতা একসঙ্গে কাজে লাগানো গেলে পরিবেশবান্ধব বালাই ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব।
উপকারী পোকা নিয়ে গবেষণার সম্ভাবনা থাকলেও এই প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বাধা রয়েছে। প্রথমত, উপকারী পোকা নির্ভরযোগ্যভাবে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা দরকার। দ্বিতীয়ত, সঠিক সময়ে কৃষকের হাতে সেগুলি পৌঁছে দিতে হবে। তৃতীয়ত, জমিতে প্রয়োগের পর ফলাফল পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
অনেক ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে উপকারী পোকা চেনা বা ব্যবহার করার পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ফলে প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী ক্ষেত্র এবং কৃষি পরামর্শ পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। গবেষণাগারে উৎপাদিত উপকারী পোকা বাজারজাত করার আগে তার গুণমান, প্রজাতি এবং কার্যকারিতা যাচাই করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জৈবিক বালাই দমনকে সফল করতে হলে শুধু পোকা উৎপাদন করলেই হবে না; কৃষকের চাহিদা, স্থানীয় পরিবেশ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা—সব দিকেই নজর দিতে হবে।
কৃষিক্ষেত্রে উপকারী পোকামাকড়ের ব্যবহার প্রমাণ করে যে প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় রেখেও ফসল রক্ষার কার্যকর পদ্ধতি গড়ে তোলা সম্ভব। আধুনিক গবেষণার সাহায্যে প্রাকৃতিক শত্রুদের চিহ্নিত করা, তাদের বংশবিস্তার বাড়ানো এবং কৃষকের জমিতে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে পরিবেশবান্ধব কৃষির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।
তবে এই পদ্ধতির সাফল্য নির্ভর করবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, স্থানীয় উপযোগিতা, কৃষকের প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের উপর। রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে সব ক্ষেত্রে শুধু উপকারী পোকা যথেষ্ট হবে না; বরং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই তাদের সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।