শাসকের আইন নয়, চাই আইনের শাসন

21 Jun 2026
07:32 AM

শাসকের আইন নয়, চাই আইনের শাসন

বাংলায় গণতন্ত্রের মূল সঙ্কট কোথায়?

গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের শক্তি কখনও কোনও ব্যক্তি, দল বা শাসকের হাতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একটি সুস্থ সমাজে সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকে আইনের। কারণ আইনই নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু যখন আইন শাসকের ইচ্ছার অনুগামী হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্র ধীরে ধীরে ভয়, প্রতিহিংসা এবং অন্যায়ের যন্ত্রে পরিণত হয়।

আজ বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে—
এখানে কি সত্যিই আইনের শাসন চলছে, নাকি শাসকের আইন?

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুলিশ, প্রশাসন, আদালত এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলির কাজ হওয়া উচিত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে আজ এমন এক ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ক্ষমতার রঙ বদলালেই বদলে যায় আইনের প্রয়োগও। বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা, শাসকদলের বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রশাসনিক নীরবতা, আবার সাধারণ মানুষের ক্ষোভে দ্রুত কড়া পদক্ষেপ—এই দ্বিচারিতার অভিযোগ ক্রমেই প্রবল হচ্ছে।

আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হল সমান বিচার। সেখানে শাসক, বিরোধী, সাধারণ নাগরিক—সকলেই আইনের চোখে সমান। কিন্তু যদি রাজনৈতিক পরিচয় বিচার নির্ধারণ করে, তাহলে সংবিধানের মৌলিক চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন নাগরিকের মনে জন্ম নেয় অবিশ্বাস। মানুষ ভাবতে শুরু করে—
“আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান?”

বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিহিংসার রাজনীতি এক গভীর সমস্যা। ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় প্রশাসনিক আচরণ, শুরু হয় অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, গ্রেফতারি, দমননীতি কিংবা রাজনৈতিক চাপের রাজনীতি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, দুর্বল হয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনও শাসকই চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতা আসে যায়, কিন্তু আইনের মর্যাদা নষ্ট হলে তার ক্ষতি বহন করতে হয় পুরো সমাজকে। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি হল প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা।

বাংলার মানুষ বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী। এই মাটিই গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রতিবাদের ভাষা শিখিয়েছে। তাই বাংলার ভবিষ্যৎও নির্ভর করবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের উপর—
আমরা কি ব্যক্তি বা দলের প্রতি আনুগত্যকে বড় করব, নাকি সংবিধান ও আইনের প্রতি বিশ্বাসকে?

কারণ সভ্য সমাজে শেষ কথা কোনও শাসক বলে না।
শেষ কথা বলে আইন।