নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: আবাস যোজনার বাড়ির জন্য সরকারি সার্ভে করাতে ১০ হাজার টাকা এবং বাড়ির টাকা অ্যাকাউন্টে ঢোকার পর আরও ১০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করার অভিযোগ উঠল। শুধু তাই নয়, সেই টাকা দিতে অস্বীকার করে প্রতিবাদ করায় এক শারীরিক প্রতিবন্ধী রাজমিস্ত্রিকে তুলে নিয়ে গিয়ে বাগানের মধ্যে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর এবং কুয়োয় ফেলে খুন করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুর থানা এলাকায়।
আক্রান্ত ব্যক্তির নাম শাহাবুদ্দিন শেখ। তাঁর বাড়ি বিষ্ণুপুর থানার অন্তর্গত চাওয়ালী এলাকায়। পেশায় তিনি একজন রাজমিস্ত্রি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁর পক্ষে নিয়মিত পরিশ্রমের কাজ করাও কঠিন বলে জানিয়েছেন তিনি। সংসারের আর্থিক অনটনের মধ্যে সরকারি আবাস প্রকল্পের বাড়ির টাকা পাওয়ার আশায় ছিলেন শাহাবুদ্দিন। কিন্তু সেই সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়াতেই তাঁকে ঘুষ চাওয়া এবং শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ।
কীভাবে শুরু হয় ঘটনার সূত্রপাত?
শাহাবুদ্দিনের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম দফায় আবাস যোজনার অধীনে তিনি ৬০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে নতুন করে সরকারি আবাস প্রকল্পের সার্ভে শুরু হলে তাঁর বাড়ি নিয়েও আশার আলো দেখেন তিনি। অভিযোগ, ২৮২ নম্বর বুথের বুথ সভাপতি নিজাম মোল্লার মাধ্যমে তাঁর বাড়ির সার্ভের কাজ চলছিল।
পাশের বাড়িতে আবাস যোজনার কাজ হতে দেখে নিজের বাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চান শাহাবুদ্দিন। তিনি বুথ সভাপতিকে প্রশ্ন করেন, তাঁর বাড়িটিও সরকারি প্রকল্পের আওতায় তৈরি হবে কি না। অভিযোগ, তখন তাঁকে রাজু মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
শাহাবুদ্দিনের দাবি, এরপর রাজু মোল্লা তাঁর কাছে মোট ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। প্রথমে বাড়ির সার্ভে করানোর জন্য ১০ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে বাড়ির টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকলে আরও ১০ হাজার টাকা দিতে বলা হয়। শুধু তাই নয়, জব কার্ডের ২৭ হাজার টাকা থেকেও আরও ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
টাকা দিতে অস্বীকার, তারপরেই হামলার অভিযোগ
শাহাবুদ্দিনের অভিযোগ, আর্থিক অনটনের কারণে তাঁর পক্ষে এই টাকা দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই তিনি ঘুষের টাকা দিতে অস্বীকার করেন। বিষয়টি স্থানীয় নেতা আনিসুর বাবু-সহ কয়েকজনকে জানান বলেও দাবি করেছেন তিনি।
অভিযোগ, এই ঘটনার পর থেকেই তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। শেষ পর্যন্ত শনিবার রাতে ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনা।
বাইকে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর ও খুনের হুমকি
আক্রান্ত শাহাবুদ্দিনের বয়ান অনুযায়ী, শনিবার রাতে বাড়ি ফেরার সময় জুম্মার নাম করে তাঁকে একটি বাইকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর তাঁকে সুপর্ণর কচারী বাগানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ।
সেখানে রাজু মোল্লা, ইজাজ মোল্লা-সহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি আক্রান্তের। তাঁর অভিযোগ, সেখানে তাঁকে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর করা হয়। এমনকি তাঁকে উদ্দেশ্য করে, "শালাকে মেরে কুয়োয় ফেলে দে" বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।
শুধু শাহাবুদ্দিনকেই নয়, যাঁদের কাছে তিনি অভিযোগ জানিয়েছিলেন, তাঁদেরও মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর।
এক পর্যায়ে কোনওভাবে দরজা খোলা পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে যান শাহাবুদ্দিন। সেই সময় দুটি বাইকের আরোহী তাঁকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করেন এবং হাসপাতালে নিয়ে যান বলে জানা গিয়েছে।
'আমি প্রতিবন্ধী মানুষ, ঘুষের টাকা কোথা থেকে দেব?'
ঘটনার পর নিজের অসহায়তার কথা জানাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আক্রান্ত শাহাবুদ্দিন। তাঁর বক্তব্য, তিনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। নিয়মিত কাজ করে সংসার চালানো তাঁর পক্ষে কঠিন। তাঁর স্ত্রী শাড়ির কাজ করে সংসারের খরচ চালান। ধারদেনা করে কোনওরকমে বাড়ি তৈরি করেছেন তাঁরা।
শাহাবুদ্দিনের কথায়, "আমি হ্যান্ডিক্যাপ মানুষ, খাটতে পারি না। বউ শাড়ির কাজ করে সংসার চালায়। ধারদেনা করে ঘর করেছি, ঘুষের টাকা কোথা থেকে দেব?"
তাঁর দাবি, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য যদি টাকা দিতে হয়, তাহলে তাঁর মতো আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষেরা কোথায় যাবেন? সরকারি আবাস প্রকল্পের উদ্দেশ্যই হল যাঁদের পাকা বাড়ি নেই বা যাঁরা আর্থিকভাবে দুর্বল, তাঁদের মাথার উপর একটি নিরাপদ ছাদ তৈরি করে দেওয়া। সেখানে যদি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রকৃত উপভোক্তাদের সমস্যায় পড়তে হয়।
বিষ্ণুপুর থানায় লিখিত অভিযোগ, তদন্তে পুলিশ
এই ঘটনার পর আক্রান্ত শাহাবুদ্দিন শেখ বিষ্ণুপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মারধর, অপহরণ করে আটকে রাখা এবং প্রাণনাশের হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে।
পুলিশের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন আক্রান্ত। পুলিশ অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গিয়েছে।
সব মিলিয়ে, আবাস যোজনার বাড়ির টাকা পাওয়ার জন্য ঘুষ চাওয়া থেকে শুরু করে এক শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে মারধর ও খুনের হুমকির অভিযোগ—এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। সরকারি আবাস প্রকল্পের স্বচ্ছতা, উপভোক্তাদের নিরাপত্তা এবং দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠছে।
এখন দেখার, পুলিশি তদন্তে কী তথ্য সামনে আসে এবং এই ঘটনায় দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী আইনি পদক্ষেপ করা হয়।