নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকেরই দিন শুরু হয় এক কাপ গরম কফি দিয়ে। কারও কাছে কফি মানেই সকালের সতেজতা, আবার কারও কাছে এটি প্রতিদিনের অভ্যাস। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস জল পান না করেই যদি সরাসরি কফি পান করেন, তাহলে রক্তচাপের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে? এই অভ্যাস কি হৃদ্যন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর? নাকি পরিমিত পরিমাণে কফি পান করলে বিশেষ কোনও সমস্যা নেই? স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মনে এই প্রশ্নগুলি প্রায়ই দেখা যায়।
চিকিৎসা ও গবেষণার তথ্য বলছে, কফিতে থাকা ক্যাফেইন সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তবে সকালে জল পান করার আগে কফি খাওয়ার ফলে রক্তচাপের উপর আলাদা কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে সরাসরি গবেষণা এখনও সীমিত। অর্থাৎ শুধু পানি না খেয়ে আগে কফি পান করলেই রক্তচাপ বেড়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
কফির অন্যতম সক্রিয় উপাদান ক্যাফেইন। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে এবং শরীরে কিছু সময়ের জন্য রক্তনালির সংকোচন ঘটাতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, যাঁরা নিয়মিত কফি পান করেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের প্রভাবে রক্তচাপ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। তবে যাঁরা প্রতিদিন কফি পান করেন, তাঁদের শরীরে ধীরে ধীরে ক্যাফেইনের প্রতি সহনশীলতা তৈরি হতে পারে। ফলে একই পরিমাণ কফি পান করলেও রক্তচাপের পরিবর্তন কম হতে পারে।
সাধারণত কফি পান করার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই সাময়িক প্রভাব দেখা যেতে পারে। তবে প্রত্যেকের শরীরের প্রতিক্রিয়া এক নয়। কারও ক্ষেত্রে সামান্য কফিতেই বুক ধড়ফড়, অস্থিরতা বা রক্তচাপ বৃদ্ধির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
রাতভর ঘুমের পর শরীর কিছুটা তরলের ঘাটতিতে থাকতে পারে। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠে জল পান করা শরীরের স্বাভাবিক জলীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে, ক্যাফেইনের হালকা মূত্রবর্ধক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত কফি পান করেন না বা একসঙ্গে বেশি পরিমাণে ক্যাফেইন গ্রহণ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রস্রাবের পরিমাণ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে পরিমিত কফির মধ্যেও জলীয় উপাদান থাকে। তাই সাধারণভাবে এক কাপ কফি পান করলেই শরীর মারাত্মকভাবে জলশূন্য হয়ে যায়, এমন ধারণা সঠিক নয়।
তবুও সকালে জল পান না করে শুধু কফির উপর নির্ভর করা ভালো অভ্যাস নয়। বিশেষ করে গরম আবহাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম বা শরীরে আগে থেকেই পানির ঘাটতি থাকলে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।
সকালে খালি পেটে কফি পান করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অ্যাসিডিটি, বুকজ্বালা, পেটে অস্বস্তি বা অম্বলের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ক্যাফেইন এবং কফির অন্যান্য উপাদান হজমতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
যাঁদের আগে থেকেই অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে খালি পেটে কফি পান করলে অস্বস্তি বাড়তে পারে। এমন হলে সকালে প্রথমে জল পান করে হালকা খাবার খাওয়া এবং তার পরে কফি পান করা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ থাকলেই যে সম্পূর্ণভাবে কফি বন্ধ করতে হবে, এমন নয়। তবে কতটা কফি পান করছেন এবং পান করার পর শরীরে কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা খেয়াল রাখা জরুরি।
মায়ো ক্লিনিকের পরামর্শ অনুযায়ী, ক্যাফেইন রক্তচাপ সাময়িকভাবে বাড়াতে পারে। তাই নিজের শরীরে এর প্রভাব বোঝার জন্য কফি পান করার আগে এবং পান করার ৩০ থেকে ১২০ মিনিট পরে রক্তচাপ মেপে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত কফি পান করেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা কার্যকর হতে পারে।
যাঁদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই, হৃদ্রোগ রয়েছে অথবা চিকিৎসক ক্যাফেইন সীমিত করতে বলেছেন, তাঁদের ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত। নিজের ইচ্ছায় রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ করা বা তার মাত্রা পরিবর্তন করা কখনওই ঠিক নয়।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন সাধারণত নিরাপদ সীমার মধ্যে ধরা হয়। এটি আনুমানিক তিন থেকে পাঁচ কাপ সাধারণ কফির সমান হতে পারে। তবে কফির ধরন, কাপের আকার এবং তৈরির পদ্ধতি অনুযায়ী ক্যাফেইনের পরিমাণ অনেকটাই বদলে যায়।
অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে কয়েকটি সমস্যা দেখা দিতে পারে—
বুক ধড়ফড় বা হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়া।
অস্থিরতা ও উদ্বেগ।
ঘুমের সমস্যা বা অনিদ্রা।
সাময়িকভাবে রক্তচাপ বৃদ্ধি।
কারও কারও ক্ষেত্রে অ্যাসিডিটি ও বুকজ্বালা।
বিশেষ করে এনার্জি ড্রিংক বা অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সকালের রুটিনে কয়েকটি সহজ পরিবর্তন আনলে শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে।
১. ঘুম থেকে উঠে প্রথমে এক গ্লাস সাধারণ পানি পান করুন।
২. শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত জল পান করুন।
৩. খালি পেটে কফি পান করলে অস্বস্তি হলে হালকা খাবারের পরে কফি পান করুন।
৪. অতিরিক্ত চিনি ও সিরাপ মেশানো কফি এড়িয়ে চলুন।
৫. উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
৬. সন্ধ্যা বা রাতের দিকে বেশি ক্যাফেইন পান করা থেকে বিরত থাকুন, কারণ এতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
সকালে জল পান করার আগে কফি পান করলেই রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়, এমন কোনও নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে কফির ক্যাফেইন কিছু মানুষের রক্তচাপ সাময়িকভাবে বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, সকালে জল পান করলে রাতের পর শরীরের জলীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে সুবিধা হয়।
তাই দিনের শুরুতে প্রথমে এক গ্লাস জল পান করে, নিজের শরীরের সহনশীলতা অনুযায়ী পরে কফি জল করাই একটি ভালো অভ্যাস হতে পারে। মনে রাখতে হবে, সুস্থ থাকার জন্য শুধু কফির সময় নয়, বরং পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।