নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে আরও একবার নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যের প্রমাণ দিল আফগানিস্তান। একের পর এক দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে আইসিসি পুরুষদের ওয়ানডে দলীয় র্যাঙ্কিংয়ে নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে গেল আফগান ক্রিকেট দল। সদ্য প্রকাশিত র্যাঙ্কিংয়ে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে আফগানিস্তান। এর আগে কখনও ৫০ ওভারের ক্রিকেটে এতটা উঁচু স্থানে পৌঁছতে পারেনি দলটি। স্বাভাবিকভাবেই এই সাফল্য আফগান ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত আইসিসির সর্বশেষ র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কাকে পিছনে ফেলে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে আফগানিস্তান। এর আগে বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলিকে পিছনে ফেলেছিল তারা। এবার শ্রীলঙ্কাকেও টপকে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করল দলটি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আফগানিস্তানের ক্রমবর্ধমান শক্তির অন্যতম বড় প্রমাণ এই সাফল্য।
কীভাবে এল এই ঐতিহাসিক সাফল্য?
আফগানিস্তানের এই উত্থানের পিছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাদের ওয়ানডে সিরিজ জয় দলকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। আয়ারল্যান্ডের মাটিতে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ৪-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল আফগানিস্তান। ব্যাটিং এবং বোলিং—দুই বিভাগেই ধারাবাহিকতা দেখিয়েছিল তারা।
এরপর সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে জিম্বাবোয়ে ও বাংলাদেশের সঙ্গে ত্রিদেশীয় সিরিজেও অপরাজিত ছিল আফগানিস্তান। প্রতিযোগিতার ফাইনালে জিম্বাবোয়েকে সাত উইকেটে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় তারা। এই টুর্নামেন্টে আফগানিস্তানের ক্রিকেটারদের সম্মিলিত পারফরম্যান্স বিশেষভাবে নজর কেড়েছিল। রশিদ খান বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং সিরিজের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কারও পান।
ওয়ানডে ক্রিকেটে শক্তিশালী হয়ে উঠছে আফগানিস্তান
আইসিসির তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ১৯১টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে আফগানিস্তান। তার মধ্যে ৯৬টি ম্যাচে জয় পেয়েছে তারা। দলের জয়-পরাজয়ের অনুপাত ১.০৯। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান কতটা শক্তিশালী করে তুলেছে আফগান দল।
২০০৯ সালে প্রথমবার ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয় আফগানিস্তানের। সেখান থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের উন্নতির পথে এগিয়েছে তারা। একসময় সহযোগী সদস্য দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পরিচিত আফগানিস্তান ২০১৭ সালে টেস্ট খেলার মর্যাদা পায়। এরপর থেকে ক্রিকেটের তিনটি ফরম্যাটেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে দলটি।
২০২৩ বিশ্বকাপ থেকেই বদলাতে শুরু করে আফগানিস্তানের পরিচিতি
২০২৩ সালের আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের পারফরম্যান্স ক্রিকেটবিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিল তারা। সেই বিশ্বকাপের পর থেকেই আফগানিস্তানকে আর শুধু উদীয়মান ক্রিকেট দল হিসেবে দেখা হয় না। বরং বড় দলগুলির বিরুদ্ধে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে এমন একটি প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে তারা।
এরপর ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথমবার সেমিফাইনালে পৌঁছে আরও একটি ঐতিহাসিক নজির তৈরি করে আফগানিস্তান। সেই সাফল্য দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।
রশিদ খান, গুরবাজদের হাত ধরে এগোচ্ছে দল
আফগানিস্তানের সাফল্যের পিছনে রশিদ খান, রহমানউল্লাহ গুরবাজ, ইব্রাহিম জাদরান, রহমত শাহ-সহ একাধিক ক্রিকেটারের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার মেলবন্ধনে দলটি ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে স্পিন বোলিংয়ে আফগানিস্তানের শক্তি বরাবরই আলোচনায় থাকে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাটিং বিভাগেও ধারাবাহিকতা এসেছে। কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
এবার লক্ষ্য আরও উপরে ওঠা
আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে ষষ্ঠ স্থানে পৌঁছনো নিঃসন্দেহে আফগানিস্তানের জন্য বড় অর্জন। তবে এখানেই থেমে থাকতে চাইবে না দলটি। শীর্ষ পাঁচে প্রবেশ করা এবং ভবিষ্যতে আরও বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের সাফল্য ধরে রাখাই এখন তাদের সামনে অন্যতম লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে, ২০০৯ সালে ওয়ানডে ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করা আফগানিস্তানের এই উত্থান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের গল্প। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, আত্মবিশ্বাস এবং দলগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এবার নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবার আইসিসি পুরুষদের ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এল তারা। আফগান ক্রিকেটের কাছে এই দিন নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।