নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক : গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা এবং পুলিশ-জনতার মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও মজবুত করার লক্ষ্যে অভিনব উদ্যোগ নিল কুলতলী থানা। রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, কুলতলী থানা প্রাঙ্গণে আয়োজিত হল ‘কুলতলী থানা পুলিশ-জনতা সম্প্রীতি দড়ি টানাটানি প্রতিযোগিতা ২০২৬’। থানার অফিসার ইনচার্জ নির্মল দাসের ব্যবস্থাপনায় এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। এলাকার মোট ২৪টি দলের অংশগ্রহণে শক্তি, কৌশল এবং দলগত সংহতির লড়াইয়ে মেতে ওঠেন প্রতিযোগীরা। প্রতিযোগিতা শেষে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানাধিকারী দলগুলিকে জার্সি, ট্রফি ও নগদ অর্থ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।
গ্রামবাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে দড়ি টানাটানি খেলা, যা বহু এলাকায় ‘কাছি টানা’ নামে পরিচিত। একসময় গ্রামের বিভিন্ন উৎসব, মেলা এবং সামাজিক মিলনমেলায় এই খেলা ছিল অন্যতম আকর্ষণ। গ্রামের মানুষ দল বেঁধে এই খেলায় অংশ নিতেন। খেলার মাঠে তৈরি হত উত্তেজনা, আনন্দ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য পরিবেশ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক বিনোদনের প্রসার এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে বহু ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলার জনপ্রিয়তা কমেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই এই খেলাগুলি এখন আর আগের মতো পরিচিত নয়। সেই পরিস্থিতিতে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন করে সামনে আনতে কুলতলী থানা পুলিশের এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
এই আয়োজনের মাধ্যমে শুধু একটি প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়নি, বরং গ্রামের নিজস্ব সংস্কৃতি ও খেলাধুলার ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার বার্তাও দেওয়া হয়েছে।
কুলতলী থানা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই দড়ি টানাটানি প্রতিযোগিতায় থানা এলাকার মোট ২৪টি দল অংশগ্রহণ করে। অংশগ্রহণকারী দলগুলির মধ্যে ছিল গোপালগঞ্জ, জালাবেড়িয়া ১ ও ২, কুন্দখালি, মেরিগঞ্জ ১ ও ২, দেউলবাড়ি, চুপড়িঝাড়া, নলগোড়া-সহ বিভিন্ন এলাকার দল।
প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে খেলোয়াড়দের মধ্যে দেখা যায় প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনা। মাঠে দড়ি ধরে দুই দলের টানাটানি, জয়ের জন্য মরিয়া চেষ্টা এবং সতীর্থদের উৎসাহ দেওয়ার দৃশ্য পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
দড়ি টানাটানি খেলায় শুধু শারীরিক শক্তি থাকলেই চলে না। প্রয়োজন সঠিক কৌশল, দলের সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় এবং সঠিক সময়ে সম্মিলিতভাবে শক্তি প্রয়োগের দক্ষতা। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী দলগুলির মধ্যে সেই দলগত সংহতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ছবিই ফুটে ওঠে।
এই প্রতিযোগিতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে পারস্পরিক আস্থা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ গড়ে তোলা। সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং প্রশাসনিক কাজের জন্য পুলিশের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ হয়। কিন্তু খেলাধুলা ও সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই সম্পর্ককে আরও আন্তরিক করে তোলার সুযোগ তৈরি হয়।
কুলতলী থানার এই উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকার মানুষের একত্রিত হওয়া সেই ভাবনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একই মাঠে বিভিন্ন এলাকার দলগুলির অংশগ্রহণ এবং একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়ার মধ্য দিয়ে সামাজিক মেলবন্ধনের পরিবেশ তৈরি হয়।
খেলার মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও তার পাশাপাশি থাকে সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সৌহার্দ্য। এই মূল্যবোধগুলি সমাজে সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কুলতলী থানার অফিসার ইনচার্জ নির্মল দাসের ব্যবস্থাপনায় এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পুলিশের এই উদ্যোগে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, জনসম্পর্ক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি এবং আস্থার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতে পারে।
কুলতলীর এই প্রতিযোগিতা সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। লোকজ খেলাকে কেন্দ্র করে এলাকার বিভিন্ন দলের একত্রিত হওয়া সামাজিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রতিযোগিতা শেষে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানাধিকারী দলগুলিকে পুরস্কৃত করা হয়। বিজয়ী দলগুলির হাতে তুলে দেওয়া হয় জার্সি, ট্রফি এবং নগদ অর্থ।
পুরস্কার বিতরণী পর্বে প্রতিযোগীদের উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। জয়ের আনন্দের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী দলগুলির কাছে এই আয়োজন হয়ে ওঠে নিজেদের দক্ষতা ও দলগত শক্তি তুলে ধরার একটি বিশেষ সুযোগ।
তবে এই প্রতিযোগিতার গুরুত্ব শুধু বিজয়ীদের পুরস্কার পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন এলাকার মানুষের অংশগ্রহণ, ঐতিহ্যবাহী খেলাকে ঘিরে উৎসাহ এবং সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি একটি বৃহত্তর সামাজিক বার্তা বহন করেছে।
গ্রামবাংলার বহু লোকজ খেলা একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক উৎসবের অংশ ছিল। এই খেলাগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামীণ সংস্কৃতি, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সম্মিলিত আনন্দের ইতিহাস। তাই এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
কুলতলী থানার উদ্যোগে আয়োজিত কাছি টানা প্রতিযোগিতা নতুন প্রজন্মের সামনে সেই ঐতিহ্যকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতেও এই ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকলে গ্রামবাংলার লোকজ খেলাধুলার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে।
পাশাপাশি, খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকার মানুষের একত্রিত হওয়া সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলতেও সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২৪টি দলের অংশগ্রহণে কুলতলী থানার প্রাঙ্গণে আয়োজিত ‘পুলিশ-জনতা সম্প্রীতি দড়ি টানাটানি প্রতিযোগিতা ২০২৬’ হয়ে উঠল লোকজ ঐতিহ্য, খেলাধুলা এবং সামাজিক মেলবন্ধনের এক বিশেষ আয়োজন।
একদিকে হারিয়ে যেতে বসা কাছি টানা খেলাকে নতুন করে সামনে আনার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বার্তা একটাই—ঐতিহ্যের টানে, সম্প্রীতির বন্ধনে; পুলিশ ও জনতা একসঙ্গে এগিয়ে চলুক। গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতি বেঁচে থাকুক নতুন প্রজন্মের হাত ধরে, আর খেলাধুলার মধ্য দিয়ে আরও মজবুত হোক মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন।