সম্পাদকের কলমে: বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেতাদের সঙ্গে মোবাইলে ছবি তোলাটা যেন একপ্রকার প্যাশনে পরিণত হয়েছে। কোনও বড় নেতা এলাকায় এলেন, কোথাও সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে, কেউ বিজয়ের শুভেচ্ছা জানাতে গেলেন কিংবা কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিলেন—আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। কে নেতার কতটা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে পারলেন, কার ছবিতে নেতার মুখ কতটা স্পষ্ট, কার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় কত বেশি প্রচার পেল, তা নিয়েই যেন তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা।
কিন্তু প্রশ্ন হল, নেতার সঙ্গে একটি ছবি তোলাই কি রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে বড় প্রমাণ? একটি ছবির মাধ্যমেই কি প্রমাণ হয়ে যায় যে সংশ্লিষ্ট কর্মীর সঙ্গে নেতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে? নাকি সেই ছবিকে সামনে রেখে নিজের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দেখানোর একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে?
বাস্তব রাজনীতির দিকে তাকালে এই প্রশ্নগুলি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
বড় নেতার পাশে দাঁড়িয়ে একটি ছবি তোলা, তারপর সেটি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা—এখন অনেকের কাছেই রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ছবির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় নানা বার্তা, শুভেচ্ছা, স্লোগান কিংবা নেতার প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ। ছবিটি দেখেই অনেকে মনে করেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয়তো দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেউ। তাঁর সঙ্গে নেতার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে, ভবিষ্যতে তিনি কোনও বড় পদ পেতে পারেন, এমনকী কোনও সুপারিশের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব থাকতে পারে।
কিন্তু একটি ছবি কি সত্যিই সেই সম্পর্কের প্রমাণ?
রাজনীতিতে পরিচয় থাকা এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনও অনুষ্ঠানে একজন নেতা শত শত মানুষের সঙ্গে ছবি তুলতে পারেন। সেই ছবির প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। অথচ অনেক সময় এই সাধারণ বিষয়টিকেই কেন্দ্র করে তৈরি হয় রাজনৈতিক প্রভাবের কৃত্রিম আবহ।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে, রাজনীতিতে মানুষের কাজের মূল্যায়ন হবে, নাকি ক্যামেরার সামনে তাঁর অবস্থান দেখে গুরুত্ব নির্ধারণ করা হবে?
রাজনৈতিক দলের বুথস্তরের কর্মী থেকে শুরু করে ব্লক ও জেলা স্তরের অনেক কর্মীই বছরের পর বছর সংগঠনের জন্য কাজ করেন। কেউ মানুষের সমস্যার কথা শোনেন, কেউ সরকারি পরিষেবা পেতে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করেন, কেউ ভোটের সময় বাড়ি বাড়ি ঘোরেন, আবার কেউ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দলের সংগঠন ধরে রাখার চেষ্টা করেন।
কিন্তু তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ যখন দেখেন, অন্য একজন নেতা বা জনপ্রতিনিধির সঙ্গে ছবি তুলে নিজেকে বিশেষ ঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরছেন, তখন তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—তাহলে কি এতদিনের কাজের চেয়ে নেতার সঙ্গে একটি ছবি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
কেউ হয়তো মনে করেন, নেতার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলে ভবিষ্যতে সাংগঠনিক পদ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কেউ আবার ভাবেন, সেই পরিচয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিগত কোনও সুপারিশ বা সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। অবশ্য প্রত্যেকেই যে এমন উদ্দেশ্যে ছবি তোলেন, তা নয়। অনেকেই শ্রদ্ধা, আবেগ কিংবা স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ছবি তোলেন। কিন্তু যখন ছবি তোলার উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে নিজের রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা, তখনই তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনীতিতে ব্যক্তিগত পরিচিতি থাকতেই পারে। কিন্তু সেই পরিচিতি যেন সাংগঠনিক যোগ্যতা, জনসংযোগ এবং মানুষের জন্য কাজ করার বিকল্প হয়ে না ওঠে।
রাজনীতির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, নেতার সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ না পাওয়া নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি বা হতাশা তৈরি হওয়া। কোনও কর্মী হয়তো বছরের পর বছর সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু কোনও বড় অনুষ্ঠানে তিনি নেতার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে পারলেন না। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত নতুন কেউ সেই সুযোগ পেয়ে গেলেন। তখন তুলনা শুরু হয়—কে কতটা কাছের, কে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কার প্রভাব কত বেশি।
কিন্তু একজন প্রকৃত কর্মীর মূল্য কি এইভাবে নির্ধারণ করা যায়?
যে কর্মী সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের পাশে থাকেন, এলাকার রাস্তা, পানীয় জল, নিকাশি, স্বাস্থ্য পরিষেবা কিংবা অন্যান্য নাগরিক সমস্যার সমাধানের জন্য চেষ্টা করেন, তাঁর অবদান কি শুধুমাত্র একটি ছবির অভাবে ছোট হয়ে যায়? যিনি নির্বাচনের সময় মানুষের দরজায় পৌঁছন, মানুষের অভাব-অভিযোগ শোনেন এবং সংগঠনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ বজায় রাখেন, তাঁর পরিচয় কি কোনও নেতার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক সেকেন্ডের ছবির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ?
নিশ্চয়ই নয়।
একজন কর্মীর প্রকৃত পরিচয় তাঁর কাজের মধ্যে ফুটে ওঠে। মানুষের বিপদে তিনি কতটা পাশে দাঁড়ালেন, এলাকার উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা কতটা, সাধারণ মানুষ তাঁকে কতটা বিশ্বাস করেন—এসবই হওয়া উচিত তাঁর মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি।
নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শনের প্রবণতা আজকের নয়। দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক পরিসরে নেতার পাশে থাকা, তাঁর সঙ্গে পরিচয় থাকা কিংবা তাঁর কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগে সেই পরিচয়ের প্রকাশ ঘটত ব্যক্তিগত আলাপ, সভা-সমিতিতে উপস্থিতি কিংবা পরিচিত মহলে প্রভাব দেখানোর মাধ্যমে। এখন স্মার্টফোন এবং সামাজিক মাধ্যম সেই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
আগে কোনও নেতার সঙ্গে দেখা হওয়ার খবর হয়তো কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন একটি ছবি মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ছবির সঙ্গে লেখা কয়েকটি শব্দ কখনও কখনও বাস্তব সম্পর্কের চেয়েও বড় একটি ধারণা তৈরি করতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমের এই ক্ষমতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে তার ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ছবি স্মৃতি ধরে রাখার মাধ্যম হতে পারে, রাজনৈতিক কর্মসূচির নথি হতে পারে, জনসংযোগের অংশও হতে পারে। কিন্তু ছবিকে যদি নিজের যোগ্যতার শংসাপত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যই কোথাও না কোথাও আড়ালে চলে যায়।
এই প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু কর্মীদের দিকে আঙুল তুললেই হবে না। নেতৃত্বেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। দলের বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। কে কতদিন কাজ করেছেন, কে কতটা সাংগঠনিক দক্ষতা দেখিয়েছেন, কে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন এবং কে বাস্তবে এলাকার উন্নয়নের জন্য উদ্যোগী হয়েছেন—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
কোনও কর্মী নেতার সঙ্গে কতগুলি ছবি তুলেছেন, কতবার তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন কিংবা সামাজিক মাধ্যমে কতটা প্রচার পেয়েছেন, তার ভিত্তিতে যদি তাঁর গুরুত্ব নির্ধারিত হতে থাকে, তাহলে নিষ্ঠাবান কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
নেতৃত্বের উচিত কর্মীদের এমন বার্তা দেওয়া, যেখানে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার চেয়ে সাংগঠনিক নিষ্ঠা, সততা, দক্ষতা এবং জনসেবার মূল্য বেশি। একই সঙ্গে কর্মীদেরও বুঝতে হবে, নেতার সঙ্গে পরিচয় থাকা মানেই নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা নয়।
রাজনীতি মূলত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ। এই সম্পর্ক তৈরি হয় দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং কাজের মাধ্যমে। একটি ছবি সেই সম্পর্কের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা তৈরি করতে পারে না।
একজন কর্মী যদি মানুষের সমস্যার সময় পাশে না থাকেন, অথচ বড় নেতার সঙ্গে ছবি তুলে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে সেই প্রচারের স্থায়িত্ব কতটা? অন্যদিকে, যিনি নীরবে মানুষের জন্য কাজ করেন, যাঁর ছবি হয়তো কখনও সংবাদমাধ্যমে আসে না, সামাজিক মাধ্যমেও প্রচার পায় না, অথচ এলাকার মানুষ বিপদে পড়লে প্রথমে তাঁর কাছেই যান—রাজনীতির প্রকৃত সম্পদ তো তিনিই।
দলীয় নেতৃত্বের কাছেও এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা কি এমন কর্মী চান, যাঁরা শুধু মঞ্চে সামনে থাকার জন্য প্রতিযোগিতা করবেন, নাকি এমন কর্মী চান, যাঁরা মানুষের পাশে থেকে সংগঠনকে শক্তিশালী করবেন?
রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরও।
নেতার সঙ্গে ছবি তোলায় কোনও দোষ নেই। শ্রদ্ধেয় কোনও ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখা স্বাভাবিক। সমস্যা তখনই, যখন সেই ছবিকে ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা বিশেষ সম্পর্কের ধারণা তৈরি করার চেষ্টা হয়। সমস্যা তখনই, যখন ছবি না তুলতে পারাকে অপরাধ মনে করা হয়, কিংবা ছবিতে জায়গা না পাওয়াকে রাজনৈতিক গুরুত্ব হারানোর সমান বলে ধরে নেওয়া হয়।
মনে রাখা দরকার, একটি ছবি কাউকে সাময়িকভাবে পরিচিত করতে পারে, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে না। একটি ছবি কাউকে নেতার পাশে দাঁড় করাতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিতে পারে না।
যে প্রকৃত কর্মী, তাঁর পরিচয় কোনও নেতার পাশে দাঁড়িয়ে তোলা ছবিতে নয়। তাঁর পরিচয় সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার মধ্যে, এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার মধ্যে এবং মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে।
রাজনীতিতে ছবির গুরুত্ব থাকুক, কিন্তু ছবিই যেন রাজনীতির পরিচয় হয়ে না ওঠে। কারণ দিনের শেষে মানুষ মনে রাখেন না, কে নেতার সঙ্গে কতবার ছবি তুলেছিলেন। মানুষ মনে রাখেন, বিপদের দিনে কে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের সমস্যার কথা কে শুনেছিলেন এবং তাঁদের জীবনে পরিবর্তন আনার জন্য কে সত্যিই কাজ করেছিলেন।
নেতার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা সহজ, কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস অর্জন করাই প্রকৃত রাজনৈতিক যোগ্যতা।