Home ফ্যাক্ট ফাইল পঞ্চায়েতের পাঁচ কাহন পৌর বার্তা জেলার চালচিত্র চাষী ভাই বলছি শরীর স্বাস্থ্য জেলার সেনাপতি মাঠে ময়দানে বিনোদন সম্পাদকীয় কলম
BREAKING NEWS
ধুনুচির তালে খোশমেজাজে তারকারা, পুজোর আবহে জমজমাট তারকাদের আড্ডা   •   কাকদ্বীপে প্রশাসনিক বৈঠক ও জনসভা মুখ্যমন্ত্রীর, চোরবাগান দুর্ঘটনায় মৃত স্নেহা ভান্ডারীর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের কর্মসূচি   •   বাড়িতে মাছ চাষ শুরু করার ১০টি কারণ, অল্প জায়গায় ব্যবসার সুযোগ ও বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা   •   স্বাস্থ্য ভবন থেকে মেডিক্যাল কলেজগুলির সঙ্গে বৈঠক, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও সুশাসনে বিশেষ জোর   •   নিউ ইয়র্কের পর এবার কলকাতাতেও ঘোড়ায় টানা গাড়ি বন্ধের উদ্যোগ! বিকল্প হিসেবে আসছে ই-ভিক্টোরিয়া?   •   টমেটো গাছের পাতা কুঁকড়ে যাওয়া রোগ দমনের সঠিক সমাধান, ফলন বাঁচাতে কী করবেন চাষিরা?

টমেটো গাছের পাতা কুঁকড়ে যাওয়া রোগ দমনের সঠিক সমাধান, ফলন বাঁচাতে কী করবেন চাষিরা?

24 Oct 2026
06:43 AM


নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: টমেটো চাষ করতে গিয়ে অনেক সময় দেখা যায়, গাছের পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে, নতুন পাতা ছোট হয়ে আসছে, পাতার রং হলুদ হয়ে যাচ্ছে এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি থমকে দাঁড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ফুল ও ফল ধারণ কমে যেতে পারে। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন চাষিরা। তাই টমেটো গাছের পাতা কুঁকড়ে যাওয়ার কারণ চিহ্নিত করে সঠিক পদ্ধতিতে রোগ ও পোকা দমন করা অত্যন্ত জরুরি।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, টমেটোর পাতা কুঁকড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল টমেটো লিফ কার্ল ভাইরাস। সাধারণত সাদা মাছি বা হোয়াইটফ্লাই এই ভাইরাস আক্রান্ত গাছ থেকে সুস্থ গাছে ছড়িয়ে দেয়। তবে অতিরিক্ত গরম, অনিয়মিত জলসেচ, অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার এবং শিকড়ের ক্ষতির কারণেও পাতায় কুঁকড়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই শুধু পাতা দেখে কীটনাশক প্রয়োগ না করে প্রথমে সমস্যার প্রকৃতি বোঝা দরকার। 

টমেটো গাছের পাতা কুঁকড়ে যাওয়ার লক্ষণ কী কী?

টমেটো গাছের পাতা কুঁকড়ে যাওয়ার সমস্যায় আক্রান্ত হলে কয়েকটি লক্ষণ বিশেষভাবে নজরে আসে।

১. পাতা কুঁকড়ে যাওয়া: নতুন পাতাগুলি ছোট হয়ে যায় এবং অনেক সময় পাতার কিনারা উপরের দিকে অথবা নিচের দিকে বেঁকে যায়। ভাইরাসজনিত সংক্রমণে পাতায় কুঁচকে যাওয়া ও বিকৃতির লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

২. পাতার রং পরিবর্তন: আক্রান্ত গাছের নতুন পাতায় হলদেটে ভাব দেখা দিতে পারে। পাতার শিরার মধ্যবর্তী অংশের রং ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে।

৩. গাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়া: রোগের প্রকোপ বাড়লে গাছ খাটো হয়ে যায়, পর্বমধ্যের দূরত্ব কমে আসে এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

৪. ফুল ও ফল কম হওয়া: আক্রান্ত গাছে ফুল এলেও অনেক সময় তা ঝরে যায়। ফল ধরার হার কমে যেতে পারে এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে।

৫. পাতার নিচে সাদা মাছি: পাতার নিচের দিকে ছোট সাদা পোকা দেখা গেলে সতর্ক হতে হবে। গাছ নাড়ালে এই পোকাগুলি উড়ে যেতে পারে। এরা টমেটোর লিফ কার্ল ভাইরাস ছড়ানোর অন্যতম বাহক। 

টমেটো গাছের পাতা কুঁকড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ

১. সাদা মাছির আক্রমণ

টমেটো গাছের লিফ কার্ল ভাইরাস ছড়ানোর অন্যতম প্রধান বাহক হল সাদা মাছি। এই পোকা গাছের রস শোষণ করে এবং আক্রান্ত গাছ থেকে ভাইরাস সুস্থ গাছে পৌঁছে দিতে পারে। জমিতে সাদা মাছির সংখ্যা বাড়লে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়।

২. অতিরিক্ত গরম ও অনিয়মিত জলসেচ

মাটিতে কখনও অতিরিক্ত জল জমে থাকা, আবার কখনও দীর্ঘ সময় জল না দেওয়া গাছের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত গরম ও শুষ্ক পরিবেশেও পাতার স্বাভাবিক গঠন বদলে যেতে পারে।

৩. অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার

প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ইউরিয়া বা নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পাতার কিনারা ভেতরের দিকে গুটিয়ে যায়।

৪. আগাছা ও আক্রান্ত গাছ

জমির আশপাশে থাকা কিছু আগাছা সাদা মাছির আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করতে পারে। আবার আক্রান্ত চারা জমিতে লাগালে শুরু থেকেই রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।

৫. আগাছানাশকের প্রভাব

জমির আশপাশে আগাছানাশক ওষুধের অনিচ্ছাকৃত প্রয়োগ বা বাতাসে ওষুধের কণা উড়ে এসে টমেটো গাছে পড়লেও পাতার বিকৃতি দেখা দিতে পারে। তাই রোগ নির্ণয়ের সময় জমিতে সম্প্রতি কী কী ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও বিবেচনা করা উচিত।

টমেটো গাছের পাতা কুঁকড়ে যাওয়া রোগ দমনের সঠিক উপায়

প্রথমেই আক্রান্ত গাছ চিহ্নিত করুন

যদি দেখা যায়, কয়েকটি গাছের নতুন পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে, গাছের বৃদ্ধি থেমে রয়েছে এবং পাতার রং হলদেটে হয়ে যাচ্ছে, তাহলে সেই গাছগুলি ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। ভাইরাসজনিত লিফ কার্ল রোগের সন্দেহ হলে আক্রান্ত গাছের সংখ্যা ও রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণ করুন।

প্রাথমিক পর্যায়ে অল্প কয়েকটি গাছ আক্রান্ত হলে এবং ভাইরাসের লক্ষণ স্পষ্ট থাকলে সেগুলি শিকড়-সহ তুলে জমি থেকে সরিয়ে নিরাপদে নষ্ট করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আক্রান্ত গাছ জমিতে ফেলে রাখবেন না এবং সুস্থ গাছের পাশে জমা করবেন না। এতে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ভাইরাসে আক্রান্ত গাছকে শুধু কীটনাশক স্প্রে করে সম্পূর্ণ সুস্থ করা যায় না। ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হল ভাইরাসবাহী সাদা মাছি নিয়ন্ত্রণ করা এবং সুস্থ গাছগুলিকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা।

হলুদ স্টিকি ট্র্যাপ ব্যবহার করুন

টমেটো জমিতে সাদা মাছির উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রাপ্তবয়স্ক পোকা ধরার জন্য হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করা যেতে পারে। জমির বিভিন্ন অংশে ফাঁদ বসালে কোথায় পোকার আক্রমণ বেশি হচ্ছে, তা বোঝা সহজ হয়।

ফাঁদের সংখ্যা ও অবস্থান জমির আকার, ফসলের পর্যায় এবং স্থানীয় কৃষি দপ্তরের সুপারিশ অনুযায়ী নির্ধারণ করুন। হলুদ ফাঁদ একা ভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করতে পারে না; এর সঙ্গে আক্রান্ত গাছ অপসারণ, আগাছা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে হবে।

জমির আগাছা পরিষ্কার রাখুন

টমেটো জমির আশপাশে থাকা আগাছা নিয়মিত পরিষ্কার করুন। বিশেষ করে সাদা মাছির আশ্রয়স্থল হতে পারে এমন আগাছা সরিয়ে ফেলুন। তবে আগাছা পরিষ্কারের সময় টমেটো গাছের শিকড়ে আঘাত লাগানো থেকে বিরত থাকুন।

সুষম সার ও নিয়ন্ত্রিত জলসেচ

মাটির আর্দ্রতা বজায় রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী জল দিন। জমিতে জল জমতে দেবেন না, আবার গাছকে দীর্ঘ সময় জলাভাবেও রাখবেন না। মাটির পরীক্ষা ও ফসলের পর্যায় অনুযায়ী সার প্রয়োগ করুন। শুধু পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে বলে অতিরিক্ত ইউরিয়া দেওয়া ঠিক নয়।

সুস্থ চারা ব্যবহার করুন

পরবর্তী মরশুমে রোগমুক্ত ও নির্ভরযোগ্য উৎসের চারা ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে জাল দিয়ে সুরক্ষিত নার্সারিতে চারা তৈরি করুন। জমির চারপাশে উপযুক্ত বাধা ফসল চাষ এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সাদা মাছির অনুপ্রবেশ কমানোর ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।

কোন ওষুধ ব্যবহার করবেন?

টমেটোর পাতা কুঁকড়ে যাওয়ার সঙ্গে সাদা মাছির আক্রমণ যুক্ত থাকলে পোকার সংখ্যা, ফসলের বয়স এবং স্থানীয় অনুমোদিত কৃষি-পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়। তবে মনে রাখতে হবে, কীটনাশক ভাইরাসকে মেরে গাছকে সারিয়ে তোলে না; এটি ভাইরাসবাহী পোকা নিয়ন্ত্রণের একটি অংশমাত্র।

কৃষি দপ্তরের পরামর্শে নিমভিত্তিক অনুমোদিত পণ্য বা টমেটো ও সাদা মাছির জন্য অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। কোন সক্রিয় উপাদান ব্যবহার করবেন, তার মাত্রা কত হবে এবং কত দিন পর পুনরায় প্রয়োগ করতে হবে—এসব নির্ভর করবে পণ্যের লেবেল, পোকার উপস্থিতি এবং স্থানীয় নির্দেশিকার ওপর।

  • ওষুধ কেনার আগে পণ্যের লেবেলে টমেটো ফসল ও সংশ্লিষ্ট পোকার জন্য অনুমোদন রয়েছে কি না যাচাই করুন।

  • লেবেলে নির্ধারিত মাত্রা ও সুরক্ষাবিধি মেনে চলুন।

  • একই ধরনের কীটনাশক বারবার ব্যবহার না করে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

  • ফুলের সময় মৌমাছি ও অন্যান্য উপকারী পতঙ্গের ক্ষতি এড়াতে সতর্ক থাকুন।

  • ফসল তোলার আগে ওষুধের লেবেলে নির্ধারিত অপেক্ষাকাল মেনে চলুন।

  • একাধিক কীটনাশক বা অন্য রাসায়নিক নিজের সিদ্ধান্তে মিশিয়ে স্প্রে করবেন না।

কেবল পাতার আকৃতি দেখে রোগ নিশ্চিত করা কঠিন। তাই জমিতে রোগের লক্ষণ বেশি দেখা দিলে কাছের কৃষি দপ্তর, কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র বা উদ্ভিদ রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে আক্রান্ত পাতার ছবি এবং গাছের নমুনা দেখিয়ে পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ভাইরাসের রোগ আর সাধারণ পাতা গোটানো—পার্থক্য বুঝবেন কীভাবে?

সব ধরনের পাতা গোটানোই ভাইরাসের লক্ষণ নয়। পার্থক্য বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় লক্ষ করুন।

ভাইরাসের সম্ভাবনা বেশি: নতুন পাতা ছোট ও বিকৃত, গাছ খাটো, পর্বমধ্য ছোট, পাতায় হলদেটে ভাব এবং সাদা মাছির উপস্থিতি।

জল বা তাপজনিত সমস্যার সম্ভাবনা: মূলত নিচের দিকের পুরোনো পাতা ভেতরের দিকে গুটিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নতুন পাতা মোটামুটি স্বাভাবিক এবং গাছের বৃদ্ধি খুব বেশি ব্যাহত হয়নি।

পোকার আক্রমণের সম্ভাবনা: পাতার নিচে ছোট পোকা, রুপোলি দাগ, সূক্ষ্ম ক্ষত বা পাতার রস শোষণের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

এই লক্ষণগুলি প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে, কিন্তু সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়।

টমেটো চাষে আগাম সতর্কতা কেন জরুরি?

টমেটোর পাতা কুঁকড়ে যাওয়ার সমস্যায় প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ অনেক বেশি কার্যকর। তাই চারা লাগানোর আগে জমি ও নার্সারি পরিষ্কার রাখা, সুস্থ চারা বেছে নেওয়া, নিয়মিত গাছ পরীক্ষা করা, হলুদ আঠালো ফাঁদ বসানো এবং সাদা মাছির উপস্থিতি নজরে রাখা দরকার।

সপ্তাহে অন্তত কয়েকবার গাছের নতুন পাতা ও পাতার নিচের অংশ পরীক্ষা করলে প্রাথমিক পর্যায়েই সমস্যা চিহ্নিত করা সম্ভব। আক্রান্ত গাছ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে রোগের বিস্তার কমানোর সুযোগ বাড়ে।

সঠিক রোগ নির্ণয়, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনাই টমেটো গাছ সুস্থ রাখা ও ফলন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ।