নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: গঙ্গাসাগরে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিজেপি নেতা উত্তম মাইতি। স্থানীয় বাসিন্দা মমতাজ বিবির অভিযোগ, প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া এবং এলাকার বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে নগদ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এই ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর পুলিশ উত্তম মাইতিকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনাটি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর বিধানসভা এলাকার গঙ্গাসাগর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত বলে অভিযোগকারীর বক্তব্য। বিষয়টি সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা। তবে অভিযোগের সত্যতা এবং টাকা নেওয়ার পিছনে প্রকৃত কারণ কী, তা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।
মমতাজ বিবির অভিযোগ, তাঁর স্বামী শেখ মোরসালিম, যিনি ‘মনি’ নামেও পরিচিত, তাঁকে ঘিরে গঙ্গাসাগর কোস্টাল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। সেই মামলায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং প্রশাসনিক স্তরে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে উত্তম মাইতি তাঁর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
অভিযোগকারীর আরও দাবি, এলাকার বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীকালে তাঁর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এরপরই তিনি স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বারস্থ হন এবং শেষ পর্যন্ত গঙ্গাসাগর কোস্টাল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন বলে জানা গিয়েছে।
মমতাজ বিবি আরও দাবি করেছেন, টাকা লেনদেনের সময় মাসুদা বিবি, লালু শেখ ও সেরাজুল উপস্থিত ছিলেন। এই ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তাঁদের উপস্থিতি সম্পর্কে পুলিশের তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
মমতাজ বিবির বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা থেকে রেহাই পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেই উদ্দেশ্যেই টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। পাশাপাশি, সাগর বিধানসভার বিধায়ক সুমন্ত মণ্ডলের নাম করেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন মমতাজ বিবি।
তাঁর দাবি, বিধায়ককে সন্তুষ্ট করা বা তাঁর মাধ্যমে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা চাওয়া হয়েছিল। তবে বিধায়ক সুমন্ত মণ্ডল এই ঘটনায় কোনওভাবে যুক্ত ছিলেন কি না, কিংবা তাঁর নাম ব্যবহার করে কেউ টাকা নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য সামনে আসেনি। তাই অভিযোগের এই অংশের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ।
অভিযোগ সামনে আসার পর মমতাজ বিবি সাগর কোস্টাল থানায় লিখিতভাবে বিষয়টি জানান বলে দাবি করেছেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ উত্তম মাইতিকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় বলে জানা গিয়েছে।
তবে আটক হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। টাকা লেনদেনের ঘটনা, অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার—সমস্ত বিষয়ই তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্তের অগ্রগতি বা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গঙ্গাসাগরের এই ঘটনাও সেই আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। অভিযোগকারীর দাবি, অসহায় পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাঁর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে তিনি স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বারস্থ হন।
এদিকে, তোলাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের কথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনায় তাঁদের বক্তব্য বা কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়া, মামলা থেকে রেহাই করিয়ে দেওয়া কিংবা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার নাম করে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়।
এই ঘটনায় সাগর বিধানসভার বিধায়ক সুমন্ত মণ্ডলের নাম উঠে আসায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। মমতাজ বিবির অভিযোগ, বিধায়কের নাম ব্যবহার করে টাকা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিধায়ক নিজে এই অভিযোগের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেবেন, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সুমন্ত মণ্ডল বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে তাঁর নাম করে টাকা নেওয়া হয়েছে কি না, তিনি এ বিষয়ে আগে থেকে কিছু জানতেন কি না, কিংবা অভিযুক্তের সঙ্গে তাঁর কোনও যোগাযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের উপর নির্ভর করছে।
কোনও জনপ্রতিনিধির নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা হয়ে থাকলে সেটিও গুরুতর বিষয়। তাই অভিযোগের প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ্যে আনা জরুরি।
গঙ্গাসাগরের এই ঘটনায় এখন মূল নজর পুলিশের তদন্তের দিকে। অভিযোগে উল্লিখিত ৫০ হাজার টাকার লেনদেন, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যাঁদের নাম এসেছে তাঁদের বক্তব্য এবং বিধায়কের নাম ব্যবহারের অভিযোগ—সবকিছু যাচাই করা প্রয়োজন।
মমতাজ বিবি ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন বলে তাঁর অভিযোগ থেকে জানা যাচ্ছে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত উত্তম মাইতির বক্তব্য এবং পুলিশের বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া সামনে এলে ঘটনার আরও দিক স্পষ্ট হতে পারে।