নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক : ধান চাষের মরশুমে জমিতে রোগবালাই ও বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মোকাবিলায় কৃষকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ধানের শীষে অস্বাভাবিক হলুদ বর্ণ দেখা দিলে বিষয়টিকে হালকাভাবে না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ধানের শীষের স্বাভাবিক রঙের পরিবর্তে যদি হলুদ বর্ণ দেখা যায় এবং তার সঙ্গে দানার গঠন ও পরিপক্বতায় অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়, তাহলে সেটি ফলস স্মাট (False Smut) রোগের লক্ষণ হতে পারে।
ফলস স্মাট মূলত ধানের শীষে দেখা দেওয়া একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এই রোগের ক্ষেত্রে ধানের দানার পরিবর্তে বা দানার সঙ্গে যুক্ত অংশে হলুদ থেকে কমলা-হলুদ রঙের অস্বাভাবিক গঠন দেখা যেতে পারে। পরে সেই অংশের রং আরও গাঢ় হয়ে যেতে পারে। ফলে আক্রান্ত জমির ধানের গুণমান ও ফলনের উপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
কৃষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হল—আক্রান্ত জমির ধানকে পরবর্তী মরশুমের বীজ হিসেবে সংরক্ষণ না করা। রোগাক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করলে পরবর্তী চাষের সময় রোগ ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সুস্থ ও রোগমুক্ত জমি থেকে ভালো মানের ধান নির্বাচন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ধানের শীষে সাধারণত দানা তৈরি হওয়ার সময় এই রোগের লক্ষণ চোখে পড়তে শুরু করে। আক্রান্ত দানার জায়গায় সবুজাভ বা হলুদাভ রঙের বলের মতো ছত্রাকের বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই অংশের রং পরিবর্তিত হয়ে কালচে বা কমলা-হলুদ হতে পারে।
তবে শুধুমাত্র শীষের হলুদ রং দেখেই নিশ্চিতভাবে ফলস স্মাট বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। ধানের জাত, আবহাওয়া, পুষ্টির ঘাটতি কিংবা অন্য রোগের কারণেও শীষের রঙে পরিবর্তন হতে পারে। তাই সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে স্থানীয় কৃষি দফতর বা কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
ধান চাষে পরবর্তী মরশুমের জন্য নিজের জমির ধান থেকে বীজ সংরক্ষণ করার প্রবণতা অনেক কৃষকের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু রোগের লক্ষণযুক্ত জমি থেকে বীজ রাখা হলে ভবিষ্যৎ চাষে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই বীজ নির্বাচন করার সময় জমির স্বাস্থ্য এবং আগের মরশুমে রোগের উপস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, বীজের জন্য এমন জমি বেছে নেওয়া উচিত যেখানে রোগের প্রকোপ দেখা যায়নি এবং গাছগুলি সুস্থ ও সবল। একই সঙ্গে পরিষ্কার ও ভালোভাবে শুকনো বীজ সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলস স্মাটের প্রকোপের সঙ্গে আবহাওয়া ও জমির পরিবেশের সম্পর্ক রয়েছে। ধানের শীষ বেরোনোর সময় আর্দ্রতা বেশি থাকা এবং অনুকূল তাপমাত্রার পরিস্থিতিতে এই ধরনের ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই শীষ বেরোনোর সময় জমি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জমিতে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত শীষ বা গাছ চিহ্নিত করে পরিস্থিতি সম্পর্কে কৃষি আধিকারিকদের জানানো যেতে পারে। নিজের মতো করে অতিরিক্ত কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার না করে অনুমোদিত কৃষি পরামর্শ মেনে চলাই নিরাপদ।
ধানের ফলন ভালো রাখতে শুধু সার ও সেচের দিকে নজর দিলেই হবে না, জমিতে রোগের লক্ষণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি। বিশেষ করে ধানের শীষ বেরোনোর পর প্রতিটি জমি ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত।
শীষে অস্বাভাবিক হলুদ বা সবুজাভ বলের মতো গঠন দেখা গেলে সতর্ক হোন, আক্রান্ত ধানকে বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করবেন না এবং প্রয়োজনে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
কারণ একটি রোগাক্রান্ত জমি থেকে বীজ বেছে নেওয়ার ভুল সিদ্ধান্ত পরবর্তী মরশুমে কৃষকের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই এবারের ধান ঘরে তোলার পাশাপাশি আগামী মরশুমের বীজ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কৃষকদের বাড়তি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।