নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: আজকের ব্যস্ত জীবনে জাঙ্ক ফুড বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার অনেকের খাদ্যাভ্যাসের নিয়মিত অংশ হয়ে উঠেছে। বাইরে কাজের ফাঁকে বার্গার, পিৎজা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, কোমল পানীয় কিংবা ইনস্ট্যান্ট নুডলস—সবই যেন হাতের নাগালে। স্বাদ ও সুবিধার কারণে এসব খাবারের প্রতি আকর্ষণও স্বাভাবিক। কিন্তু নিয়মিত ও অতিরিক্ত পরিমাণে এই ধরনের খাবার খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ধরনের প্রক্রিয়াজাত বা জাঙ্ক ফুডকে একই মাত্রায় ক্ষতিকর বলা ঠিক নয়। খাবারটি কতটা প্রক্রিয়াজাত, তাতে কতটা লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট রয়েছে, কতটা ফাইবার ও পুষ্টি রয়েছে এবং একজন মানুষ কত ঘন ঘন সেটি খাচ্ছেন—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হার্ভার্ডের পুষ্টিবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ‘processed food’ একটি বিস্তৃত শ্রেণি এবং তার মধ্যে পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যগত প্রভাবের যথেষ্ট পার্থক্য থাকতে পারে।
অনেক ultra-processed food-এ অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং বিভিন্ন ধরনের সংযোজিত উপাদান থাকতে পারে। একই সঙ্গে এসব খাবারের অনেকগুলিতে ফাইবার ও প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে নিয়মিত এই ধরনের খাবার খেলে খাদ্যতালিকার সামগ্রিক পুষ্টিমান কমে যেতে পারে।
আরেকটি সমস্যা হল—চিপস, মিষ্টি স্ন্যাকস, কোমল পানীয় কিংবা কিছু ফাস্ট ফুড খুব সহজে বেশি পরিমাণে খাওয়া হয়ে যায়। ফলে শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ হতে পারে। ২০২৬ সালের হার্ভার্ড হেলথের একটি পর্যালোচনাতেও ultra-processed food-এর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাটের পাশাপাশি অতিরিক্ত খেয়ে ফেলার প্রবণতাকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত চিনি থাকা পানীয় বিশেষভাবে নজরে রাখার মতো। এগুলোতে সাধারণত ফাইবার থাকে না এবং তরল অবস্থায় থাকা চিনি দ্রুত গ্রহণ করা সহজ। নিয়মিত অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় খাওয়ার সঙ্গে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাই তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নিয়মিত কোমল পানীয়ের পরিবর্তে জল, চিনি ছাড়া পানীয় বা অন্যান্য কম-চিনিযুক্ত বিকল্প বেছে নেওয়া যেতে পারে।
চিপস ও বিভিন্ন প্যাকেটজাত নোনতা স্ন্যাকস সাধারণত খুব সহজে বেশি পরিমাণে খাওয়া হয়ে যায়। এতে লবণ, ফ্যাট এবং ক্যালোরির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে। হার্ভার্ডের তথ্য অনুযায়ী, আলু চিপসের মতো কিছু ultra-processed food বেশি খাওয়ার সঙ্গে ওজন বৃদ্ধির সম্পর্ক দেখা গেছে।
সমস্যা শুধু একটি প্যাকেট চিপস খাওয়ায় নয়; বরং প্রতিদিন বা প্রায় প্রতিদিন এমন খাবার খাওয়ার অভ্যাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সসেজ, হট ডগ, কিছু ধরনের luncheon meat, bacon ও অন্যান্য processed meat নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা সংস্থা IARC processed meat-কে মানুষের জন্য carcinogenic বা ক্যানসার-সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে; বিশেষ করে colorectal cancer-এর সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাই নিয়মিত processed meat খাওয়ার পরিবর্তে মাছ, ডিম, ডাল, বাদাম এবং কম প্রক্রিয়াজাত প্রোটিনের উৎস খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
বার্গার বা ফ্রাই একবার খেলেই যে শরীরের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে, এমন নয়। কিন্তু বড় আকারের বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং চিনিযুক্ত কোমল পানীয় একসঙ্গে খেলে একবারের খাবারেই অনেক ক্যালোরি, সোডিয়াম, চিনি ও ফ্যাট চলে আসতে পারে।
বিশেষ করে নিয়মিত এই ধরনের কম্বো খাওয়ার অভ্যাস ওজন বৃদ্ধি এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
কুকিজ, প্যাকেটজাত কেক, ডোনাট ও বিভিন্ন মিষ্টি স্ন্যাকসে অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট এবং ফ্যাট থাকতে পারে। এগুলো স্বল্প সময়ে আনন্দ দিলেও পুষ্টিকর খাবারের জায়গা দখল করলে খাদ্যতালিকায় ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
স্বাদ, গন্ধ, মিষ্টতা, নোনতা স্বাদ ও মচমচে texture—সব মিলিয়ে অনেক ultra-processed খাবার অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ফলে পেট ভরে গেলেও আরও খেতে ইচ্ছা করতে পারে। গবেষণায় ultra-processed diet-এর সঙ্গে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ এবং ওজন বৃদ্ধির সম্পর্কও দেখা গেছে।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সব processed food-কে একসঙ্গে ‘খারাপ খাবার’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগ করা থাকে এবং কম চিনি, কম সোডিয়াম ও পর্যাপ্ত ফাইবারযুক্ত কিছু প্যাকেটজাত খাবার সুষম খাদ্যের অংশ হতে পারে।
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় বেশি ultra-processed food গ্রহণের সঙ্গে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগসহ একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের একটি বৃহৎ গবেষণা-পর্যালোচনাতেও ultra-processed food বেশি খাওয়ার সঙ্গে একাধিক প্রতিকূল স্বাস্থ্যফলের সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে এই ধরনের observational research থেকে সব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করা যায় না।
২০২৫ সালের একটি হার্ভার্ড পর্যালোচনায়ও বেশি ultra-processed food গ্রহণকারীদের মধ্যে BMI, কোমরের মাপ, রক্তচাপ, ইনসুলিন ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মতো বিভিন্ন বিপাকীয় সূচকের সঙ্গে খারাপ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সবার ক্ষেত্রে একেবারে পুরোপুরি বন্ধ করাই একমাত্র সমাধান—এমন নয়। বরং কতটা, কত ঘন ঘন এবং কোন ধরনের খাবার খাওয়া হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য, বাদাম, বীজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাছ, ডিম বা অন্যান্য পুষ্টিকর প্রোটিনের উৎস বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি জাঙ্ক ও ultra-processed food-এর পরিমাণ ধীরে ধীরে কমানো বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হতে পারে।
প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় শুধু সামনে থাকা ‘healthy’, ‘natural’ বা ‘low fat’ ধরনের শব্দ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে Nutrition Facts ও ingredients list দেখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে added sugar, sodium, saturated fat এবং fiber-এর পরিমাণ খেয়াল করা যেতে পারে।
জাঙ্ক ফুডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পরিমাণ, নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস এবং খাবারের সামগ্রিক পুষ্টিমান। মাঝে মধ্যে পছন্দের খাবার খাওয়া এবং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভর করা—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়।
যে খাবার যত বেশি চিনি, অতিরিক্ত লবণ, অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও কম পুষ্টিমান বহন করে এবং যত সহজে অতিরিক্ত খাওয়া হয়ে যায়, সেটিকে খাদ্যতালিকায় তত বেশি সীমিত রাখার কথা ভাবা উচিত। অন্যদিকে, তাজা বা কম প্রক্রিয়াজাত খাবারকে নিয়মিত খাদ্যতালিকার ভিত্তি করা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।