নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: সরকারের নির্দেশে রাজ্যের বিভিন্ন রাস্তায় মেরামতির কাজ শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই মেরামতির গুণমান নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার একাধিক রাজ্য সড়ক ও জাতীয় সড়কের বেহাল দশা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও রাস্তার পিচ উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও আবার সেই গর্ত ভরাট করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ইট। কিন্তু ইট দিয়ে গর্ত ভরাট করলেই কি রাস্তা সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ হয়? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভার অন্তর্গত একতারা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় হটুগঞ্জ থেকে ঘটকপুকুর মোড় পর্যন্ত রাস্তার বেহাল দশা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তাটির বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। কোথাও পিচের আস্তরণ উঠে গিয়েছে, আবার কোথাও রাস্তার উপর তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ফলে প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন যানবাহনের চালক, নিত্যযাত্রী, পথচারী এবং এলাকার ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় বছরখানেক আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার আর্থিক সহযোগিতায় এই রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ, একটি বর্ষা কাটতে না কাটতেই রাস্তার বিভিন্ন অংশের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে পড়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে রাস্তার এমন বেহাল দশা দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে নির্মাণকাজের গুণমান, ব্যবহৃত সামগ্রী এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিয়ে।
একটি রাস্তা নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়া। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার রাস্তা শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, তা স্থানীয় অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। সেই রাস্তা যদি নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তবে রাস্তার ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হলে নির্মাণের নথি, ব্যবহৃত সামগ্রীর মান, কাজের তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থাকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু রাস্তার বর্তমান অবস্থা যদি সত্যিই এমন হয়, তাহলে বিষয়টি দ্রুত পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
রাস্তার বেহাল দশা নিয়ে অভিযোগ সামনে আসার পর সরকারের নির্দেশে জেলা পরিষদের আর্থিক তহবিল থেকে রাস্তার গর্ত ভরাটের কাজ করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, যেভাবে স্থায়ী রাস্তা সংস্কার হওয়ার কথা, সেইভাবে কাজ হচ্ছে না। রাস্তার গর্তে ইট ফেলে আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে সাময়িকভাবে গর্তের গভীরতা কিছুটা কমলেও রাস্তার সার্বিক সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষ করে যানবাহন চলাচলের সময় ইটের উপর দিয়ে চাকা যাওয়ায় চারদিকে ধুলো উড়ছে। শুষ্ক আবহাওয়ায় সেই ধুলো আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। রাস্তার পাশে থাকা দোকানপাট, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং বাড়িঘরের মধ্যে ধুলো ঢুকে পড়ায় সমস্যায় পড়ছেন এলাকার মানুষ।
স্থানীয়দের বক্তব্য, রাস্তার গর্ত ভরাট করা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই কাজ এমনভাবে করতে হবে যাতে কয়েক দিনের মধ্যেই আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে না আসে। ইট ফেলে সাময়িক মেরামতির পরিবর্তে রাস্তার উপযুক্ত স্থায়ী সংস্কার হওয়া দরকার। না হলে একদিকে যেমন যান চলাচলে সমস্যা থাকবে, অন্যদিকে ধুলোর কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়তে থাকবে।
হটুগঞ্জ-রায়দীঘি রোডের ফটোগঞ্জ থেকে ঘটকপুকুর মোড় পর্যন্ত অংশের বেহাল অবস্থা নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই পথের বিভিন্ন অংশে গর্ত এবং মেরামতির কাজে ব্যবহৃত ইটের কারণে যানবাহন চলাচলের সময় ধুলো ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন দেউলার বাস মোড় এলাকার দোকানদাররা। প্রতিদিন দোকান খুলে ব্যবসা চালাতে গিয়ে তাঁদের ধুলোর সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। দোকানের সামগ্রী, খাবারদাবার এবং অন্যান্য পণ্যের উপর ধুলো জমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে। ক্রেতাদেরও ধুলোময় পরিবেশের মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
এক স্থানীয় ব্যবসায়ীর কথায়, এই দুর্ভোগ কবে শেষ হবে, তা তাঁদের জানা নেই। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার সমস্যার কারণে তাঁরা যে অসুবিধার মধ্যে রয়েছেন, তার স্থায়ী সমাধান চান তাঁরা। সরকারের কাছে তাঁদের আবেদন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক এবং নতুন সরকার যেন দ্রুত এই সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ করে।
ব্যবসায়ীদের কাছে রাস্তার অবস্থা শুধু যাতায়াতের সমস্যা নয়, তাঁদের দৈনন্দিন রোজগারের সঙ্গেও জড়িত। ক্রেতারা যদি ধুলো ও ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে সমস্যায় পড়েন, তাহলে বাজারে আসা-যাওয়াও ব্যাহত হতে পারে। ফলে রাস্তার উন্নতি হলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি এলাকার ছোট ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হবেন।
রাস্তা সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কাজের স্থায়িত্ব। রাস্তার উপরিভাগে পিচ উঠে গেলে কিংবা বড় বড় গর্ত তৈরি হলে শুধু ইট দিয়ে তা ঢেকে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। রাস্তার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী মেরামতি, উপযুক্ত উপকরণ ব্যবহার এবং কাজের গুণমান যাচাই করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ অনুযায়ী, রাস্তার ক্ষয়ক্ষতির কারণ চিহ্নিত না করে বারবার উপরিভাগে মেরামতি করলে একই সমস্যা ফিরে আসতে পারে। বৃষ্টির জল জমা, নিকাশি ব্যবস্থার দুর্বলতা, ভারী যানবাহনের চাপ কিংবা নির্মাণের গুণগত ত্রুটি—বিভিন্ন কারণে রাস্তা দ্রুত নষ্ট হতে পারে। তবে হটুগঞ্জ-ঘটকপুকুর রাস্তার ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, রাস্তার যে অংশগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলি দ্রুত চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি যানবাহন চলাচলের সময় যাতে ধুলো কম ছড়ায়, সেই ব্যবস্থাও নিতে হবে। রাস্তা সংস্কারের কাজ শেষ হলে তার গুণমান নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার বেহাল দশা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ নতুন নয়। গ্রামীণ এলাকার সড়কগুলির উপর নির্ভর করে বহু মানুষ প্রতিদিন কর্মস্থল, স্কুল-কলেজ, বাজার এবং হাসপাতাল-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াত করেন। সেই রাস্তায় গর্ত থাকলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়তে পারে এবং যাত্রার সময়ও বেড়ে যায়।
হটুগঞ্জ থেকে ঘটকপুকুর মোড় পর্যন্ত রাস্তার সমস্যার ক্ষেত্রেও দ্রুত প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। রাস্তার বর্তমান অবস্থা খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে একটি নির্দিষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কোন অংশে কী ধরনের কাজ প্রয়োজন, কত দিনের মধ্যে তা শেষ হবে এবং কাজের গুণমান কীভাবে যাচাই করা হবে—এই বিষয়গুলি স্পষ্ট হওয়া দরকার।
বিশেষ করে দেউলার বাস মোড়ের মতো জনবহুল এলাকায় ধুলো নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ যান চলাচলের ব্যবস্থা করা জরুরি। রাস্তার পাশে থাকা দোকানদার, পথচারী এবং নিত্যযাত্রীদের কথা মাথায় রেখে মেরামতির কাজ করা উচিত। প্রয়োজনে কাজ চলাকালীন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাও দরকার।
হটুগঞ্জ-রায়দীঘি রোডের ফটোগঞ্জ থেকে ঘটকপুকুর মোড় পর্যন্ত রাস্তার দুরবস্থা নিয়ে স্থানীয় মানুষের বক্তব্য স্পষ্ট—তাঁরা সাময়িক মেরামতি চান না, চান স্থায়ী সমাধান। রাস্তা নির্মাণের এক বছরের মধ্যেই যদি তা ভেঙে পড়ে, তাহলে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, তারও জবাব চান তাঁরা।
সরকারের নির্দেশে মেরামতির কাজ শুরু হওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু সেই কাজ যদি মানুষের দুর্ভোগ কমাতে না পারে, তাহলে মেরামতির পদ্ধতি ও গুণমান পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। সরকারি অর্থ ব্যয় করে রাস্তা সংস্কার করা হলে সেই কাজের সুফল যেন সাধারণ মানুষ বাস্তবে পান, সেটাই হওয়া উচিত প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
এখন দেখার বিষয়, স্থানীয় মানুষের এই অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত পদক্ষেপ করে। হটুগঞ্জ থেকে ঘটকপুকুর মোড় পর্যন্ত রাস্তার গর্ত কি স্থায়ীভাবে মেরামত হবে? দেউলার বাস মোড় এলাকার ব্যবসায়ীরা কি ধুলোর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবেন? আর মাত্র এক বর্ষার মধ্যেই বেহাল হয়ে পড়া রাস্তার নির্মাণ ও সংস্কারের গুণমান কি খতিয়ে দেখা হবে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখন সময়ের অপেক্ষা।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মানুষের দাবি একটাই—ইট ফেলে সাময়িকভাবে গর্ত ঢেকে দেওয়া নয়, চাই টেকসই রাস্তা। ধুলোর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি, নিরাপদ যাতায়াত এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ করুক সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। কারণ রাস্তা শুধু যাতায়াতের পথ নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অন্যতম ভরসা।