নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক কুসংস্কার দূর করা এবং মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা নিয়ে স্বাস্থ্য ভবনে পালিত হল বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬। এবারের মূল ভাবনা— “অভিজ্ঞতার কথা শোনা হোক: বাস্তব কণ্ঠস্বর, বাস্তব পরিবর্তন” (Lived Experiences Heard: Real Voices, Real Change)। এই ভাবনার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, তাঁদের অনুভূতি এবং তাঁদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই উপলক্ষে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা শুধু চিকিৎসা বা রোগ নির্ণয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। যাঁরা মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা মন দিয়ে শোনা এবং সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সহায়তা পরিষেবাকে আরও কার্যকর করে তোলাও সমান জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার একটি অপরিহার্য অংশ। উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, মানসিক চাপ এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার প্রভাব ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক সম্পর্কের উপর পড়তে পারে। কিন্তু এখনও সমাজের একটি অংশে মানসিক সমস্যা নিয়ে অস্বস্তি, ভুল ধারণা এবং নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। এর ফলে অনেকেই নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করতে কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দ্বিধা বোধ করেন।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের এবারের ভাবনা সেই বাধা দূর করার উপর জোর দেয়। মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা মনোযোগ দিয়ে শোনা হলে তাঁদের বাস্তব সমস্যাগুলি আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি, চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তাও চিহ্নিত করা যায়।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পেলে অন্যরাও বুঝতে পারেন যে মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হওয়া কোনও লজ্জার বিষয় নয় এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়া স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাকে ঘিরে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তিদের আরও একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেয়। কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে তাঁকে দোষারোপ করা, তাঁর সমস্যাকে গুরুত্ব না দেওয়া কিংবা তাঁকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং সমাজের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে। কারও মানসিক কষ্টের কথা মন দিয়ে শোনা, তাঁকে বিচার না করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তা নিতে উৎসাহিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য ভবনে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালনের প্রেক্ষিতে এই বার্তাই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা না করে প্রাপ্য গুরুত্ব, যত্ন ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সচেতনতা প্রচার নয়, বাস্তব জীবনে সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ এবং সহজলভ্য পরিষেবা গড়ে তোলাও জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা আরও সহজলভ্য করে তোলার ক্ষেত্রে টেলি-মানস (Tele-MANAS) একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ১৪৪১৬ নম্বরে যোগাযোগ করে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সহায়তা ও পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। যাঁরা মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা অন্য কোনও মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে উৎসাহিত করা এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
টেলি-মানসের মতো পরিষেবা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রত্যেকের পক্ষে সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া সব সময় সহজ হয় না। দূরবর্তী এলাকায় বসবাস, সামাজিক সংকোচ কিংবা পরিষেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব অনেককে সাহায্য নেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে। টেলিফোনের মাধ্যমে সহায়তার সুযোগ এই বাধাগুলির কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে টেলি-মানসের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং ধারাবাহিক পরিচর্যার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
এই উপলক্ষে ডাঃ শরদ্বত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সহায়তা পরিষেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার আরও শক্তিশালী করার বিষয়গুলি সামনে এসেছে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে খোলামেলা আলোচনা যত বাড়বে, ততই মানুষ নিজের সমস্যার কথা বলতে এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে উৎসাহিত হবেন। বিশেষ করে মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাঁরা বাস্তব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, তাঁদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হলে স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন আরও মানবিক এবং মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের গুরুত্ব একটি নির্দিষ্ট দিনের অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, ভ্রান্ত ধারণা দূর করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার কাজ সারা বছর ধরে চালিয়ে যাওয়া দরকার।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, পরিবার এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানসিক সুস্থতার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। একই সঙ্গে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান জানিয়ে তাঁদের চিকিৎসা ও পুনরুদ্ধারের পথে সহায়তা করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য ভবনে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ পালনের মূল বার্তাও তাই স্পষ্ট: মানুষের কথা শুনতে হবে, তাঁর অভিজ্ঞতাকে সম্মান করতে হবে এবং প্রয়োজনের সময় যথাযথ সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।
বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা শোনা হোক, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাঙুক নীরবতা। সহমর্মিতা, সচেতনতা ও সহজলভ্য পরিষেবার মাধ্যমেই গড়ে উঠুক আরও মানবিক সমাজ।