সম্পাদকের কলমে: প্রযুক্তির পৃথিবীতে ভারত আজ আর শুধু অনুসরণকারী নয়, ক্রমশ উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে। একসময় উন্নত প্রযুক্তির জন্য বিশ্বের কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো ভারতকে। কিন্তু সময় বদলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, ডিজিটাল পেমেন্ট, তথ্যপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, স্টার্টআপ, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে কৃষি ও শিক্ষায় প্রযুক্তির প্রয়োগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতা আজ আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত।
‘প্রযুক্তিতে ভারতের চর্চা গোটা বিশ্বে হবে’—এই প্রত্যাশা তাই নিছক আবেগের কথা নয়। এর পিছনে রয়েছে ভারতের বিপুল জনসংখ্যা, বিশাল প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকসমাজ, দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবনী মানসিকতা। তবে বিশ্বমঞ্চে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই চলবে না; নিজস্ব গবেষণা, মৌলিক উদ্ভাবন এবং বিশ্বমানের প্রযুক্তি তৈরির ক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলির একটি হল তার মানবসম্পদ। দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞান এবং গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। সেই প্রতিভাকে দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করা গেলে ভারতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আরও দ্রুত হতে পারে।
ডিজিটাল পরিষেবার ক্ষেত্রেও ভারত ইতিমধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য মডেল তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তিকে সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন সরকারি পরিষেবা, ডিজিটাল পরিচয় এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে প্রযুক্তি কেবল শহুরে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও পৌঁছেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI আগামী দিনের প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই ক্ষেত্রে ভারতের সামনে যেমন বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনই রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু বিদেশি AI প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশ হয়ে থাকলে চলবে না। ভারতকে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতার উপযোগী AI ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে ভারতীয় ভাষাগুলির জন্য উন্নত AI মডেল তৈরি করা গেলে দেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে প্রযুক্তির নতুন দরজা খুলে যেতে পারে।
ভারতের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল মহাকাশ প্রযুক্তি। তুলনামূলকভাবে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে মহাকাশ গবেষণায় ভারত যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। ভবিষ্যতে বেসরকারি সংস্থাগুলির অংশগ্রহণ আরও বাড়লে মহাকাশ প্রযুক্তি, উপগ্রহ পরিষেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মহাকাশভিত্তিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে—এই অগ্রগতির সুফল কি সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছবে? প্রযুক্তির প্রসার যদি কেবল বড় শহর এবং উচ্চআয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ডিজিটাল বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। তাই গ্রাম, ছোট শহর, প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে দ্রুতগতির ইন্টারনেট, আধুনিক ডিভাইস ও ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনের কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত বদলাবে। বহু প্রচলিত কাজের পদ্ধতি স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠবে, আবার একই সঙ্গে তৈরি হবে নতুন ধরনের পেশা। তাই শুধু প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে ভবিষ্যতের কর্মশক্তিকে প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। স্কুল ও কলেজ পর্যায় থেকেই কোডিং, ডেটা সায়েন্স, রোবোটিক্স, AI, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করা প্রয়োজন।
কিন্তু প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পথে শুধু অর্থ বিনিয়োগ করলেই হবে না। গবেষণা ও উন্নয়ন বা R&D-তে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। মৌলিক বিজ্ঞান ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পক্ষেত্র এবং সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। গবেষণাগারে তৈরি জ্ঞান যেন দ্রুত বাস্তব পণ্য ও পরিষেবায় রূপান্তরিত হয়, সেই পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ভারতের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে নতুন উৎপাদন কেন্দ্রের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। ভারত যদি দক্ষ শ্রমশক্তি, নির্ভরযোগ্য পরিকাঠামো, গবেষণা এবং উৎপাদন সক্ষমতার সমন্বয় ঘটাতে পারে, তাহলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি করা সম্ভব।
সাইবার নিরাপত্তাও আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যত বেশি পরিষেবা ডিজিটাল হবে, ততই বাড়বে তথ্য সুরক্ষার গুরুত্ব। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক লেনদেন এবং সরকারি পরিকাঠামোকে সাইবার আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
AI এবং অটোমেশনের যুগে নৈতিকতার প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য তৈরি হলেও তার অপব্যবহার যেন না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভুয়ো তথ্য, ডিপফেক, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার সমাজের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন নাগরিক তৈরি করাও জরুরি।
ভারতের প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ তাই কেবল কয়েকটি বড় সংস্থা বা শহরের সাফল্যের উপর নির্ভর করবে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে দেশের স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, স্টার্টআপ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিক। একটি সমন্বিত প্রযুক্তি-পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই ভারত বিশ্ব প্রযুক্তির মানচিত্রে আরও শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারবে।
আজ যে প্রযুক্তি বিশ্বের কোনও একটি দেশে তৈরি হচ্ছে, আগামী দিনে তার বিকল্প বা আরও উন্নত সংস্করণ ভারত থেকেও তৈরি হতে পারে। ভারতীয় সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তৈরি প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। সস্তা, কার্যকর এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উপযোগী প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা বিশ্বকে নতুন পথ দেখাতে পারে।
তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সাফল্য রাতারাতি আসে না। গবেষণায় বিনিয়োগ, শিক্ষায় সংস্কার, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পের সঙ্গে গবেষণার যোগসূত্র, স্টার্টআপের জন্য অনুকূল পরিবেশ এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারের সমন্বয় প্রয়োজন।
ভারতের সামনে সম্ভাবনার দরজা আজ অনেকটাই খোলা। প্রশ্ন হল, সেই সুযোগকে কতটা কাজে লাগানো যায়। প্রযুক্তিকে শুধু ব্যবহারের মাধ্যম না করে যদি ভারত উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, তাহলে ‘প্রযুক্তিতে ভারতের চর্চা গোটা বিশ্বে হবে’—এই কথাটি একদিন বাস্তবতাতেও পরিণত হতে পারে।
আগামী দিনের ভারত শুধু প্রযুক্তির বাজার হবে না, প্রযুক্তি তৈরির দেশ হিসেবেও বিশ্বমঞ্চে নিজের পরিচয় আরও দৃঢ় করতে পারে।