নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: কলকাতা: রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও দ্রুত রোগী পরিষেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে হাসপাতালের বেডের রিয়েল-টাইম তথ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য ভবনের ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল রুমে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক তথা স্বাস্থ্যক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।
আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে বর্তমানে কতগুলি বেড খালি রয়েছে, তার নির্ভুল এবং আপডেটেড তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে সরকারি ব্যবস্থার অধীনে সংরক্ষিত বা নির্দিষ্ট পরিষেবার জন্য বরাদ্দ বেডগুলির তথ্যও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
বর্তমানে কোনও রোগীর জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হলে পরিবারের সদস্যদের অনেক সময় একাধিক হাসপাতালে ফোন করে বা সরাসরি গিয়ে বেডের খোঁজ করতে হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে এই প্রক্রিয়ায় সময় নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
প্রস্তাবিত সমন্বিত ব্যবস্থার লক্ষ্য হল হাসপাতালগুলির বেড-সংক্রান্ত তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। এর ফলে কোনও হাসপাতালে বেড খালি রয়েছে কি না, কোথায় নির্দিষ্ট ধরনের পরিষেবা পাওয়া যেতে পারে এবং সরকারি ব্যবস্থার অধীনে কোন বেডগুলি ব্যবহারযোগ্য—এই ধরনের তথ্য দ্রুত পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
আলোচনায় বেসরকারি হাসপাতালগুলির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলিও গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা প্রদান করে।
স্বাস্থ্য দফতরের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলির মধ্যে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে বেডের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, গুরুতর অসুস্থতা, অস্ত্রোপচার, আইসিইউ বা বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে উপযুক্ত হাসপাতাল খুঁজে পেতে দেরি হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
রিয়েল-টাইম বেড-অ্যাভেলেবিলিটি ব্যবস্থা কার্যকর হলে রোগী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য প্রশাসনও পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
শুধু মোট কতগুলি বেড খালি রয়েছে, সেই তথ্যই যথেষ্ট নয়। কোন বেড সাধারণ রোগীর জন্য, কোনটি নির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্পের অধীনে, কোন বেডে বিশেষ চিকিৎসার সুবিধা রয়েছে—এই তথ্যগুলিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেডের সংখ্যা, বেডের ধরন, রোগী ভর্তি হওয়ার সম্ভাব্যতা এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের পরিষেবা সম্পর্কে আপডেটেড তথ্য রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
এই ধরনের ব্যবস্থার আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হল হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান আরও দ্রুত হওয়া।
কোনও হাসপাতালে হঠাৎ বেডের চাপ বেড়ে গেলে বা নির্দিষ্ট কোনও পরিষেবার চাহিদা বৃদ্ধি পেলে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে কোথাও বেড খালি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে সেই হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হতে পারে।
তবে এই ধরনের ব্যবস্থা সফল করতে হলে শুধু একটি সফটওয়্যার বা কন্ট্রোল রুম তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। হাসপাতালগুলিকে নিয়মিত এবং নির্ভুলভাবে বেডের তথ্য আপডেট করতে হবে।
একজন রোগী ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি সংশ্লিষ্ট বেডের স্ট্যাটাস পরিবর্তন না হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় পুরনো তথ্য থেকে যেতে পারে। একইভাবে রোগী ছাড়া পাওয়ার পর বেড খালি হওয়ার তথ্য দ্রুত আপডেট না হলে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে ডিজিটাল তথ্যের পার্থক্য তৈরি হবে।
তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি নিয়মিত ডেটা আপডেট, হাসপাতালগুলির দায়িত্ব নির্ধারণ এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য-তথ্য ব্যবস্থা ভবিষ্যতে শুধুমাত্র বেডের সংখ্যা দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বিভিন্ন পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যেমন—আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর, জরুরি বিভাগ, নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, অপারেশন থিয়েটার বা অন্যান্য জরুরি পরিষেবার প্রাপ্যতা।
এর ফলে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত হাসপাতাল চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সংগঠিত হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবায় ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার আরও বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সম্প্রতি রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারত পরিষেবা চালু করার সময়ও স্বাস্থ্য পরিষেবার তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
স্বাস্থ্য ভবনের কন্ট্রোল রুমকে কেন্দ্র করে হাসপাতালগুলির তথ্য, প্রশাসনিক নজরদারি এবং রোগী পরিষেবার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা পরিচালনায় একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো তৈরি হতে পারে।
সবশেষে, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হল রোগী ও তাঁর পরিবারের সময় এবং ভোগান্তি কমানো। কোথায় বেড আছে, কোথায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যাবে এবং সরকারি ব্যবস্থার অধীনে কোন পরিষেবা ব্যবহার করা সম্ভব—এই তথ্য দ্রুত পাওয়া গেলে জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে।
ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ভবনের ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল রুমে বেডের রিয়েল-টাইম তথ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, বেসরকারি হাসপাতালগুলির তথ্য কত দ্রুত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায় এবং তথ্য কতটা নিয়মিত আপডেট করা সম্ভব হয়—তার ওপরই ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে।