নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: হাঁচি, কাশি বা হঠাৎ চাপের সময় প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা অনেকেরই পরিচিত। কিন্তু কখনও কখনও হাসি, দৌড়ানো, ভারী কিছু তোলা কিংবা আচমকা পেটের চাপ বাড়ার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে মল বেরিয়ে আসার ঘটনাও ঘটতে পারে। ইংরেজিতে এই ধরনের ঘটনাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘shart’ বলা হয়—অর্থাৎ গ্যাস ছাড়তে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে অল্প পরিমাণ মল বেরিয়ে আসা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর সঙ্গে bowel leakage বা fecal incontinence-এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
এক-দু’বার এমন ঘটনা ঘটলেই যে গুরুতর কোনও অসুস্থতা রয়েছে, তা নয়। তবে বারবার এমন হলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
‘Shart’ কোনও চিকিৎসাবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক শব্দ নয়। সাধারণত গ্যাস বের করার চেষ্টা করার সময় অজান্তে সামান্য তরল বা নরম মল বেরিয়ে গেলে মানুষ এই শব্দটি ব্যবহার করেন।
এর অন্যতম কারণ হতে পারে—মল খুব পাতলা বা নরম থাকা, অন্ত্রে অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি হওয়া, হঠাৎ পেটের চাপ বেড়ে যাওয়া কিংবা মলদ্বারের পেশি যথেষ্ট শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা।
যদি এই ধরনের মল বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা বারবার ঘটে এবং ব্যক্তি নিজের ইচ্ছামতো মলত্যাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তাহলে সেটি fecal incontinence-এর লক্ষণ হতে পারে।
মল নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াটি শরীরের বেশ কয়েকটি অংশের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে। মলদ্বারের চারপাশের sphincter muscle, পেলভিক ফ্লোরের পেশি, মলদ্বার ও অন্ত্রের স্নায়ু এবং মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে।
এই ব্যবস্থার কোনও অংশে সমস্যা হলে মল ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
পাতলা মল সহজে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ডায়রিয়ার সময় অন্ত্রে দ্রুত মল জমা হতে পারে এবং হঠাৎ মলত্যাগের প্রবল চাপ তৈরি হতে পারে। তখন বাথরুমে পৌঁছানোর আগেই মল বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এ কারণেই ডায়রিয়া বা পেটের গোলমালের সময় গ্যাস ছাড়তে গিয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অনেকেই মনে করেন শুধু ডায়রিয়াতেই মল বেরিয়ে যাওয়ার সমস্যা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যও এর একটি কারণ হতে পারে।
কঠিন মল দীর্ঘ সময় মলদ্বারে জমে থাকলে তার চারপাশ দিয়ে অপেক্ষাকৃত তরল মল বেরিয়ে আসতে পারে। একে অনেক সময় overflow soiling বলা হয়।
মল ধরে রাখার ক্ষেত্রে anal sphincter অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বা কোনও আঘাত, অস্ত্রোপচার কিংবা প্রসবের পর এই পেশি দুর্বল হতে পারে।
পেশির নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে গ্যাস ও মলের মধ্যে পার্থক্য বুঝে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসবের সময় pelvic floor বা anal sphincter-এর পেশি ও স্নায়ুতে আঘাত লাগতে পারে। এর প্রভাব অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে না দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে মল নিয়ন্ত্রণের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তাই প্রসবের পর দীর্ঘদিন ধরে মল নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা IBS, প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ, কিছু ধরনের সংক্রমণ এবং দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ার মতো সমস্যার ক্ষেত্রেও মল নিয়ন্ত্রণের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে শুধু একটি উপসর্গের ভিত্তিতে কোনও নির্দিষ্ট রোগের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
মলত্যাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড এবং অন্ত্রের মধ্যে স্নায়বিক যোগাযোগ প্রয়োজন। ডায়াবেটিস, কিছু স্নায়ুর রোগ, মেরুদণ্ডের আঘাত বা অন্যান্য neurological সমস্যার কারণে এই নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হতে পারে।
জোরে কাশি, হাঁচি, হাসি, দৌড়ানো, ভারী ওজন তোলা বা ব্যায়ামের সময় পেটের ভেতরের চাপ হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। মল যদি খুব নরম থাকে বা sphincter নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, তখন সামান্য মল বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শরীর গ্যাস এবং মলের অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন সংকেত দেয়। কিন্তু ডায়রিয়া, অন্ত্রের গোলমাল বা মলদ্বারের সংবেদনশীলতা কমে গেলে সেই পার্থক্য বোঝা কঠিন হতে পারে।
ফলে যে ব্যক্তি মনে করছেন শুধু গ্যাস বের হবে, তার পরিবর্তে সামান্য তরল মলও বেরিয়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে পেট খারাপের সময় এই ঝুঁকি বেশি থাকে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট খাবার মল নরম করে দিতে বা অন্ত্রে গ্যাস বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত ঝাল, খুব বেশি তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, অতিরিক্ত ক্যাফেইন, কিছু কৃত্রিম মিষ্টি এবং ব্যক্তিভেদে দুধ বা নির্দিষ্ট খাবার পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে।
তবে সবার ক্ষেত্রে একই খাবার একই প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। তাই কোনও খাবার খাওয়ার পর বারবার সমস্যা হলে খাদ্যাভ্যাসের একটি ডায়েরি রাখা উপকারী হতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রেই কারণ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে এই ধরনের ঘটনা কমানো সম্ভব। তবে প্রতিরোধের উপায় নির্ভর করে সমস্যার মূল কারণের ওপর।
খুব পাতলা বা খুব শক্ত—দুই ধরনের মলই সমস্যা বাড়াতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় ফাইবার রাখা মলকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে হঠাৎ করে অতিরিক্ত ফাইবার খাওয়া ঠিক নয়। এতে কিছু মানুষের গ্যাস ও পেট ফাঁপার সমস্যা বাড়তে পারে।
নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস, পর্যাপ্ত তরল এবং শারীরিক সক্রিয়তা কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
দীর্ঘদিন মল আটকে রাখার অভ্যাস থাকলে সেটিও পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
Pelvic floor muscle শক্তিশালী করার কিছু ব্যায়াম মল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে কোন ব্যায়াম কতবার এবং কীভাবে করা উচিত, তা সমস্যা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
প্রয়োজনে চিকিৎসক বা pelvic floor physiotherapist-এর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
যে খাবারের পর বারবার ডায়রিয়া, গ্যাস বা মলত্যাগের তীব্র চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটি নোট করে রাখা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা ভালো।
মলত্যাগের চাপ এলে দীর্ঘ সময় আটকে না রাখাই ভালো। বাইরে বেরোনোর আগে বাথরুম ব্যবহার করাও অনেকের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে পারে।
একবার হালকা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বারবার মল অনিচ্ছাকৃতভাবে বেরিয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে যদি এর সঙ্গে—
বারবার ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে,
মলে রক্ত দেখা যায়,
অকারণে ওজন কমে,
তীব্র পেটব্যথা হয়,
মলত্যাগের অভ্যাস হঠাৎ বদলে যায়,
মল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ক্রমশ কমে যায়,
পা বা শরীরের অন্য অংশে দুর্বলতা/অসাড়তা দেখা দেয়,
তাহলে বিষয়টি দ্রুত চিকিৎসকের নজরে আনা প্রয়োজন।
মল নিয়ন্ত্রণের সমস্যা নিয়ে অনেকেই সামাজিক অস্বস্তি বা লজ্জার কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। কিন্তু এটি একটি বাস্তব স্বাস্থ্য সমস্যা এবং অনেক ক্ষেত্রেই এর কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা বা জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
চিকিৎসক প্রয়োজনে রোগীর খাদ্যাভ্যাস, মলত্যাগের ধরন, ওষুধের ব্যবহার এবং অন্যান্য উপসর্গ সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শও দেওয়া হতে পারে।
গ্যাস ছাড়তে গিয়ে সামান্য মল বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা অনেক সময় সাময়িক ডায়রিয়া, নরম মল বা পেটের গোলমালের কারণে হতে পারে। আবার নিয়মিত এমন হলে এর পেছনে মলদ্বারের পেশির দুর্বলতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অন্ত্রের সমস্যা বা স্নায়বিক কারণও থাকতে পারে।
তাই ঘটনাটি যদি বারবার ঘটে, শুধু ‘শার্ট’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে মূল কারণ খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, মল স্বাভাবিক রাখা, প্রয়োজনীয় ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ—এই চারটি বিষয় অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে হঠাৎ বা বারবার মল নিয়ন্ত্রণ হারানোর সঙ্গে রক্তপাত, তীব্র ব্যথা, জ্বর, দ্রুত ওজন কমা বা নতুন স্নায়বিক উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।