সম্পাদকের কলমে : বাংলা জুড়ে বেহাল রাস্তা। কোথাও বিশাল গর্ত, কোথাও হাঁটুসমান জল, কোথাও আবার পিচ উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে মৃত্যুফাঁদ। রাজ্য সড়ক হোক কিংবা জাতীয় সড়ক—একাধিক জেলায় সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের যাত্রা যেন পরিণত হয়েছে ঝুঁকির খেলায়।
বর্ষা এলেই বাংলার বহু রাস্তার চেহারা বদলে যায়। যে রাস্তা কয়েক মাস আগেও স্বাভাবিক ছিল, সেখানেই বৃষ্টির পরে দেখা যায় ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। কোথাও রাস্তার পিচ উঠে যাচ্ছে, কোথাও রাস্তার ধারে জমছে জল, আবার কোথাও জল জমে গর্ত আর রাস্তার পার্থক্য বোঝাই কঠিন হয়ে পড়ছে। দিনের আলোয় কোনওরকমে সামলে নেওয়া গেলেও রাতের অন্ধকারে সেই একই রাস্তা হয়ে উঠছে আরও বিপজ্জনক।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল—একটি রাস্তা কতদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে?
রাস্তা শুধু ইট, পাথর, বালি, পিচ আর কংক্রিটের সমষ্টি নয়। একটি রাস্তার সঙ্গে যুক্ত থাকে মানুষের জীবন, জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রতিদিনের কর্মসংস্থান। গ্রামের মানুষকে শহরে আসতে হয়, রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়, ছাত্রছাত্রীদের স্কুল-কলেজে যেতে হয়, শ্রমিককে কর্মস্থলে পৌঁছতে হয়। সেই রাস্তা যদি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তাহলে তার প্রভাব শুধু যান চলাচলের উপর পড়ে না—প্রভাব পড়ে গোটা জনজীবনের উপর।
বর্ষার আগে বা বর্ষার মুখে রাস্তা মেরামতির কাজ শুরু হওয়ার ছবি আমরা প্রায়ই দেখতে পাই। কোথাও গর্তে মাটি বা পাথর ফেলা হচ্ছে, কোথাও নতুন করে পিচ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই কাজের স্থায়িত্ব কতটা?
বর্ষা শুরু হওয়ার পর বহু জায়গায় আবার রাস্তার একই অবস্থা। কোথাও কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়নি। কোথাও কাজের পরেই রাস্তা ভেঙে পড়েছে। আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে কাজের অপেক্ষায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। ফলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—পরিকল্পনা কোথায়? কাজের মান যাচাই হচ্ছে কি? ঠিকাদারি ব্যবস্থার উপর নজরদারি কতটা রয়েছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কাজ শেষ হওয়ার পর তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কে নেবে?
রাস্তার গর্তে পড়ে বাইক উল্টে যাওয়া, জল জমা রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ির দুর্ঘটনা, অন্ধকারে গর্ত দেখতে না পেয়ে পথচারী বা দু’চাকার চালকের আহত হওয়া—এই ঘটনাগুলি এখন অনেক এলাকার পরিচিত ছবি।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পরে যদি শুধু বলা হয়, “চালক সাবধানে চালান”, তাহলে সমস্যার একটি অংশই দেখা হয়। চালকের সতর্কতা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু একটি রাস্তা যদি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা থাকে, পর্যাপ্ত আলো না থাকে, গর্ত চিহ্নিত করার ব্যবস্থা না থাকে এবং জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল হয়, তাহলে শুধুমাত্র সাধারণ মানুষকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
নিরাপদ রাস্তা পাওয়া সাধারণ মানুষের অধিকার।
প্রশাসনের দায়িত্ব হল সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাস্তার গুণমান, জল নিষ্কাশন, গর্ত মেরামত, ড্রেনেজ, রাস্তার আলো এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা—সবকিছুকেই একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
আর হাতে বেশি সময় নেই। সামনে দুর্গাপুজো। এই সময় বাংলার রাস্তায় যানবাহনের চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। মানুষ বাড়ি ফেরে, আত্মীয়ের বাড়ি যায়, পুজো দেখতে বের হয়। শহর থেকে গ্রাম, জেলা থেকে জেলা—প্রতিটি সড়কেই বাড়ে যান চলাচল।
এই পরিস্থিতিতে বেহাল রাস্তা যদি পুজোর সময়ও একই অবস্থায় থাকে, তাহলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
তাই সাধারণ মানুষের দাবি খুবই স্বাভাবিক—পুজোর আগে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার কাজ শেষ করতে হবে।
তবে শুধু তড়িঘড়ি করে পুজোর আগে রাস্তা মেরামত করলেই হবে না। তড়িঘড়ি কাজের নামে যদি নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, তাহলে পুজোর কয়েক সপ্তাহ পরেই সেই রাস্তা আবার ভেঙে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারি অর্থও নষ্ট হবে, মানুষের দুর্ভোগও চলবে।
প্রয়োজন দ্রুত কাজের সঙ্গে গুণমানের নিশ্চয়তা।
একটি রাস্তা তৈরি করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রাস্তা তৈরির পরে নিয়মিত পরিদর্শন দরকার। কোথাও ছোট গর্ত তৈরি হলে সেটি বড় হওয়ার অপেক্ষা না করে দ্রুত মেরামত করা দরকার। জল জমলে তার কারণ খুঁজে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে।
কারণ একটি ছোট গর্তই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বড় গর্তে পরিণত হতে পারে। আর একটি বড় গর্তই কখনও কখনও একটি পরিবারের জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তাই রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে ‘ভেঙে গেলে মেরামত’ পদ্ধতির বদলে ‘ভাঙার আগেই নজরদারি’ ব্যবস্থা চালু করা দরকার।
জনগণের টাকায় রাস্তা তৈরি হয়। সেই রাস্তা মেরামতেও জনগণের করের টাকা খরচ হয়। তাই রাস্তার কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি থাকা অত্যন্ত জরুরি।
কোন রাস্তার কাজ কবে শুরু হবে, কতদিনের মধ্যে শেষ হবে, কোন সংস্থা বা ঠিকাদার কাজ করছে, কাজের আনুমানিক ব্যয় কত এবং কাজের মান যাচাই করবে কে—এই তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হওয়া উচিত।
কাজের সময়সীমা শেষ হয়ে গেলেও যদি রাস্তা অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে তার কারণও জনগণকে জানানো দরকার।
কারণ রাস্তা শুধু সরকারের প্রকল্প নয়, রাস্তা জনগণের সম্পদ।
বাংলার মানুষ উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি এখন খুব সাধারণ কিছু বিষয়ের বাস্তব সমাধান চান। তাঁদের দাবি খুব বেশি নয়—রাস্তা দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চান, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে চান, অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চান, ব্যবসার মালপত্র নিয়ে নির্বিঘ্নে চলতে চান।
তাই পুজোর আগে প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন একটাই—
বেহাল রাস্তার কাজ কবে শেষ হবে?
যে রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে, তা দ্রুত শেষ হোক। যে রাস্তা এখনও কাজের অপেক্ষায়, তার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা হোক। আর যে রাস্তা ইতিমধ্যে মেরামত হয়েছে, তার গুণমানও পরীক্ষা করা হোক।
দুর্গাপুজো বাঙালির আনন্দের উৎসব। সেই উৎসবে বাড়ি ফেরার পথে কোনও পরিবার যেন বেহাল রাস্তার কারণে বিপদের মুখে না পড়ে—এটাই হওয়া উচিত প্রশাসন, ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের সম্মিলিত দায়িত্ব।
পুজোর আগে রাস্তা চাই—শুধু চলাচলের জন্য নয়, মানুষের নিরাপত্তার জন্য।
রাস্তার গর্ত ভরাট করা শুধু একটি সরকারি কাজ নয়; এটি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ। আর সেই কাজ যত দ্রুত, স্বচ্ছ এবং টেকসইভাবে করা যায়, ততই স্বস্তি ফিরবে বাংলার পথে-ঘাটে।